২৪৩৭. সুওয়ায়াদ ইবন নাসর (রহঃ) ...... আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লা্হ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে একবার কিছু মাংস আনা হল। তাঁর কাছে একটি সামনের রান তুলে ধরা হল। তিনি তা খেতে লাগলেন। সামনের মাংস তাঁর পছন্দনীয় ছিল। তিনি তা থেকে এক কামড় খেলেন। পরে বললেনঃ কিয়ামতের দিন আমিই হলাম সকল মানুষের সর্দার। তোমরা কি জান তা কেন? শুরুর এবং শেষের সব মানুষকে আল্লাহ তাআলা একই মাঠে একত্রিত করবেন। একজনের ডাকই সকলের শ্রুত হবে এবং একজনের দৃষ্টিতেই সকলের পরিলক্ষিত হবে। সূর্য তাদের নিকটবর্তী হয়ে যাবে। এমন উদ্বেগ-পেরেশানী ও কষ্ট লোকদের হবে যা তাদের সহ্য হবে না এবং যা তারা বইতেও পারবে না। লোকদের একজন আরেকজনকে বলবে তোমাদের কি যাতনা পৌছছে লক্ষ্য করছ না? এমন কাউকে দেখছ না যিনি তোমাদের প্রভুর কাছে তোমাদের জন্য সুপারিশ করবেন।
লোকেরা পরস্পর পরস্পরকে বলবেঃ চল, আদম (আঃ)-কে গিয়ে ধর। তারা আদম (আঃ)-এর কাছে আসবে। বলবে, আপনি মানবকুলের আদি পিতা। আল্লাহ আপনাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, আপনার মাঝে রূহ ফুঁকেছেন, ফিরিশতাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তাই তারা আপনার সিজদা করেছিল। আপনি আমাদের জন্য আপনার প্রভুর দরবারে সুপারিশ করুন। আপনি কি লক্ষ্য করছেন না আমরা কি অবস্থায় আছি? আপনি কি দেখছেন না কষ্টের কোন সীমায় আমরা পৌছেছি?
আদম (আঃ) তাদের বলবেনঃ আমার পরওয়ারদিগার তো আজ এমন ক্রোধান্বিত যে পূর্বেও কখনো এমন ক্রোধান্বিত হয়নি ভবিষ্যতেও কখনো এমন ক্রোধান্বিত হবেন না। তিনি তো আমাকে একটি বৃক্ষ সম্পর্কে নিষেধ করেছিলেন কিন্তু আমি তা লংঘন করে ফেলেছি, নাফসী, নাফসী, নাফসী-আজ আমার চিন্তাই আমি পেরেশান। তোমরা অন্য কারো নিকট যাও, তোমরা নূহের কাছে যাও।
তারা নূহ (আঃ) এর নিকট আসবে। বলবেঃ হে নূহ, আপনি পৃথিবীর প্রথম রাসূল। আল্লাহ আপনাকে ’’আবদান শাকুরা’’ চিরকৃতজ্ঞ বান্দা বলে উপাধি দিয়েছেন। আপনার পরওয়ারদিগারের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। দেখছেন না আমরা কি অবস্থায় আছি? আমরা কষ্টের কোন সীমায় পৌছেছি?
নূহ (আঃ) তাদের বলবেনঃ আমার পরওয়ারদিগার তো আজ এমন ক্রোধান্বিত যে পূর্বেও কখনো এমন ক্রোধান্বিত হয়নি ভবিষ্যতেও এমন ক্রোধান্বিত আর কখনো হবেন না। তিনি আমাকে একটি দুআ কবূলের প্রতিশ্রুত দিয়েছিলেন। তা আমি আমার কওমের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে ফেলেছি। নাফসী, নাফসী, নাফসী আজ আমার চিন্তায়ই আমি পেরেশান। তোমরা অন্য কারো নিকট যাও, তোমরা ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে যাও।
তারা ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে আসবে। বলবেঃ হে ইবরাহীম, আপনি আল্লাহর নবী, পৃথিবীবাসীদের মধ্যে আপনি আল্লাহর খলীল ও অন্তরঙ্গ বন্ধু। আপনার পরওয়ারদিগারের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। দেখছেন না আমরা কি অবস্থায় আছি? আমরা কষ্টের কোন সীমায় পৌছেছি?
ইবরাহীম (আঃ) তাদের বলবেনঃ আমার পরওয়ারদিগার আজ এত ক্রোধান্বিত অবস্থায় আছেন যে আগেও এমন ক্রোধান্বিত কখনও হন নাই আর পরেও কখনও এমন ক্রোধান্বিত হবেন না। আমার পক্ষ থেকে তিনটি (বাহ্যিক) অসত্য কথন হয়ে গিয়েছিলেন। নাফসী, নাফসী, নাফসী আজ আমার চিন্তায়ই আমি পেরেশান। তোমরা অন্য কারো নিকট যাও, তোমরা মূসার কাছে যাও।
তারা মূসা (আঃ)-এর কাছে আসবে। বলবেঃ হে মূসা, আপনি আল্লাহর রাসূল, তিনি আপনাকে তাঁর রিসালাত ও কালাম প্রদান করে মানুষের উপর মর্যাদা দিয়েছেন। আপনার পরওয়ারদিগারের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। দেখছেন না আমরা কি অবস্থায় আছি? আমরা কষ্টের কোন সীমায় পৌছেছি?
মূসা (আঃ) বলবেনঃ আমার পরওয়ারদিগার আজ এত ক্রেধান্বিত অবস্থায় আছেন যে আগেও এমন ক্রোধান্বিত কখনও হন নাই আর পরেও কখনও এমন ক্রোধান্বিত হবেন না। আমি তাঁর হুকুম ছাড়াই এক ব্যক্তিকে কতল করে ফেলেছিলাম; নাফসী, নাফসী, নাফসী আজ আমার চিন্তায়ই আমি পেরেশান। তোমরা অন্য কারো নিকট যাও, তোমরা ঈসার নিকট যাও।
এরপর তারা ঈসা (আঃ)-এর নিকট আসবে; বলবেঃ হে ঈসা, আপনি আল্লাহর রাসূল, আপনি আল্লাহর দেওয়া বাণী যা তিনি মারইয়াম (আঃ)-এর গর্ভে ফেলেছেন; আপনি তাঁর দেওয়া আত্মা, দোলনায় অবস্থানকালেই আপনি মানুষের সাথে বাক্যলাপ করেছেন। আপনি আপনার পরওয়ারদিগারের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। দেখছেন না আমরা কি অবস্থায় আছি? আমরা কষ্টের কোন সীমায় পৌছেছি?
ঈসা (আঃ) বলবেনঃ আজ আমার পরওয়ারদিগার এত ক্রেধান্বিত অবস্থায় আছেন যে, এরূপ ক্রোধান্বিত পূর্বে কখনও ছিলেন না এমন ক্রোধান্বিত কখনও হবেন না। উল্লেখ্য যে, ঈসা (আঃ) এখানে নিজের কোন অপরাধের কথা উল্লেখ করবেন না। নাফসী, নাফসী, নাফসী আজ আমার চিন্তায় আমি পেরেশান। তোমরা অন্য কারো কাছে যাও, তোমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাও।
তখন তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আসবে। বলবেঃ হে মুহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রাসূল, শেষ নবী, মাফ করে দেওয়া হয়েছে আপনার পূর্বেকার সব ত্রুটি। আপনি আপনার পরওয়ারদিগারের নিকট আমাদের জন্য শাফা’আত করুন। আপনি কি দেখছেন না আমরা কোন অবস্থায় আছি?
এরপর (আমি সুপারিশ করার জন্য) যাব এবং আরশের নীচে এসে আমার পরওয়ারদিগারের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হব। আল্লাহ তাআলা আমার জন্য তাঁর হামদ ও সর্বোত্তম প্রশংসার এমন কিছু উদ্ভাসিত করে দিবেন যা আমার পূর্বে আর কারো জন্য উদ্ভাসিত করা হয়নি। অতঃপর বলা হবেঃ হে মুহাম্মদ, আপনার মাথা উত্তোলন করুন। প্রার্থনা করুন আপনার প্রার্থনা কবূর করা হবে, শাফা’আত করুন, আপনার শাফা’আত গ্রহণ করা হবে।
অনন্তর আমি মাথা তুলব। বলবঃ হে পরওয়ারদিগার, আমার উম্মতকে রক্ষা করুন।
আল্লাহ বলবেনঃ হে মুহাম্মদ, আপনার উম্মতের মধ্যে যাদের কোন হিসাব নাই তাদেরকে জান্নাতের দরওয়াজা ডানদিকের দরওয়াজা দিয়ে জান্নাতে দাখিল করে দিন। অবশ্য অন্যান্য দরওয়াজার ক্ষেত্রেও তারা অপরাপর লোকদের সঙ্গেও জান্নাতে দাখিল করতে পারবে। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলবেনঃ কসম সেই যাতের যাঁর হাতে আমার প্রাণ, জান্নাতের দুই চৌকাঠের মধ্যকার দুরত্ব মক্কা ও হাজারের দুরত্বের মত এবং মক্কা ও বুসরার দুরত্বের মত। সহীহ, তাখরিজ তাহাভিয়া ১৯৮, যিলালুল জান্নাত, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২৪৩৪ [আল মাদানী প্রকাশনী]
এই বিষয়ে আবূ বকর সিদ্দীক, আনাস, উকবা ইবন আমির এবং আবূ সাঈদ রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। উক্ত হাদীসটি হাসান-সহীহ। রাবী আবূ হাইয়ান তায়মীর নাম হল ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ ইবন হাইয়ান কুফী। তিনি বিশ্বস্ত। আর আবূ যুরআ ইবন আমর ইবন জারীরের নাম হল হারিম।
২৪৮০. হান্নাদ (রহঃ) ...... আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সুফফাবাসী সাহাবীগণ ছিলেন মুসলিমদের মেহমান। তাদের কোন ঘর-সংসার বা ধন-সম্পদ ছিল না। আল্লাহর কসম, যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নাই, ক্ষুধার জ্বালায় আমি আমার পেট মাটিতে চেপে ধরতাম; এমনিভাবে ক্ষুধার তাড়নায় আমার পেটে পাথর বাঁধতাম। সাহাবীরা যে পথ দিয়ে (মসজিদের উদ্দেশ্যে) বের হতেন তাদের সে পথে একদিন আমি বসে গেলাম। আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু আমার পাশ দিয়ে গেলেন। আমি তাঁকে আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি তাঁর সঙ্গে (তার ঘরে) আমাকে নিয়ে যাবেন এই আশা নিয়েই কেবল আমি এই আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। কিন্তু তিনি চলে গেলেন। আমাকে সাথে নিয়ে গেলেন না। এরপর উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু এই পথ দিয়ে গেলেন। তাঁকেও আমি আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। তিনি যেন আমাকে (তাঁর ঘরে) সঙ্গে নিয়ে যান এই আশা নিয়েই আমি প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি চলে গেলেন কিন্তু আমাকে সাথে নিলেন না। পরে আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমাকে দেখেই মুচকি হাসলেন। বললেনঃ আবূ হুরায়রা!
আমি বললামঃ লাব্বাইকা, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেনঃ সঙ্গে চল। এরপর তিনি চলতে লাগলেন। আমিও তাঁর পেছনে পেছনে যেতে লাগলাম। তিনি তাঁর ঘরে প্রবেশ করলেন। আমিও প্রবেশ অনুমতি চাইলাম। আমাকেও প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হল। তিনি ঘরে একটি দুধের পেয়ালা পেলেন। বললেনঃ তোমাদের জন্য এই দুধ কোথা থেকে এসেছে? বলা হল অমুক ব্যক্তি আমাদের জন্য হাদিয়া পাঠিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেনঃ আবূ হুরায়রা! আমি বললামঃ লাব্বায়কা। তিনি বললেনঃ সুফফাবাসীদের কাছে যাও এবং তাদের ডেকে নিয়ে এস।
এরা ছিলেন মুসলিমদের মেহমান। এদের কোন ঘর-সংসার বা ধন-সম্পদ ছিল না। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে কিছু সাদাকা আসলে তিনি তা তাদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন, এর থেকে নিজে কিছু গ্রহণ করতেন না। আর যদি তাঁর কাছে কিছু হাদিয়া আসত তবে তিনি তাদের কাছে পাঠাতেন এবং নিজেও তা থেকে কিছু গ্রহণ করতেন এবং এতে তাদেরকেও শরীক করতেন।
এতে আমি মনক্ষুন্ন হলাম। মনে মনে বললাম সুফফাবাসীদের মাঝে এই এক পেয়ালায় কি হবে? আর আমি তাদের মাঝে সংবাদ বাহক হচ্ছি। সুতরাং নবীজীতো আমাকেই তাদের সামনে তা পরিবেশন করতে হুকুম দিবেন। হয়ত আমার ভাগ্যে কিছু নাও জুটতে পাপরে।
অথচ আমি আশা করেছিলাম যে ক্ষুধা নিবারণের মত অংশ পাব। কিন্তু আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলের আনুগত্য ছাড়া কোন উপায় নেই, তাই আমি তাদের কাছে গেলাম এবং তাদেরকে ডেকে নিয়ে এলাম। তারা এসে নিজ নিজ স্থানে বসে গেল তিনি বললেনঃ আবূ হুরায়রা, পেয়ালাটি নাও এবং তাদের পরিবেশন কর।
আমি পিয়ালাটি নিলাম এবং এক একজনকে তা পরিবেশন করতে লাগলাম, তিনি তা থেকে পরিতৃপ্তির সাথে পান করছিলেন এবং আমাকে তা ফিরিয়ে দিচ্ছেলেন। আমি তখন তা অপর জনকে দিচ্ছিলাম শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে তা নিয়ে পৌঁছলাম। ইতি মধ্যে উপস্থিত পুরা সম্প্রদায় পরিতৃপ্ত হয়ে গেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেয়ালাটি নিয়ে হাতে রাখলেন এবং এরপর মাথা তুলে মুচকি হাসলেন। বললেনঃ আবূ হুরায়রা, পান কর। আমি তা পান করলাম। তিনি পুনরায় বললেনঃ আরো পান কর। আমি পান করতে থাকলাম তিনি বলতে থাকলেন ’’তুমি পান কর’’। শেষে আমি বললাম, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন সেই সত্তার কসম, আমি আর এ জন্য কোন পথ পাচ্ছি না। তিনি তখন পেয়ালাটি নিলেন, আল্লাহর হামদ করলেন এবং বিসমিল্লাহ বলে তা পান করে নিলেন। সহীহ, বুখারি ৬৪৫২, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২৪৭৭ [আল মাদানী প্রকাশনী]
(আবু ঈসা বলেন) এ হাদীসটি হাসান-সহীহ।