১৪৩৫। শায়বান ইবনু ফাররুখ (রহঃ) ... আবু কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ভাষণে আমাদেরকে বললেন, তোমরা চলতে থাক অপরাহ্নে ও রাত্রিতে, ইনশাআল্লাহ আগামীকাল সকালে পানির নিকট পৌছে যাবে। তারপর লোকেরা এমন ভাবে পথ চলতে লাগল যে, কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছিল না। আবূ কাতাদা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও এভাবে চলছিলেন। এমনকি অর্ধরাত হয়ে গেল, আমি তাঁর পাশে ছিলাম। আবূ কাতাদা (রাঃ) বলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তন্দ্রা পেল। তিনি সাওয়ারীর উপর থেকে চলতে লাগলেন। আমি তাঁর কাছে এসে তাকে না জাগিয়ে তাঁকে ঠেস দিলাম। ফলে তিনি সাওয়ারীর উপর সোজা হয়ে গেলেন।
তিনি বলেন, তারপর চলতে থাকলেন। অবশেষে রাতের বেশী অংশ গত হলে তিনি সাওয়ারীর উপর আবার একদিকে ঢুলতে লাগলেন। আমি তাঁকে না জাগিয়ে আবার ঠেস দিলাম। ফলে তিনি সাওয়ারীর উপর সোজা হয়ে গেলেন। তারপর আবার চলতে লাগলেন। যখন সাহরীর শেষ সময় এলো তখন তিনি পূর্বের দু-বারের চাইতে এত অধিক ঢুলে পড়লেন যে, প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হল। আমি তাঁর কাছে গিয়ে তাকে আবার ঠেস দিলাম। তিনি মাথা তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, এই কে? আমি বললাম, আবূ কাতাদা। তিনি বললেন, তুমি কখন থেকে এভাবে আমার সাথে চলেছ? আমি বললাম, সারা রাত ধরে। তিনি বলেছেন, আল্লাহ তোমাকে হিফাযত করুন, যেহেতু তুমি আল্লাহর নবীকে হিফাযত করেছ।
তারপর বললেন, তুমি কি বুঝতে পাচ্ছ? আমরা কি লোকদের থেকে আড়ালে পড়ে গেছি? আবার বললেন, কাউকে কি দেখতে পাচ্ছ? আমি বললাম, এই একজন সাওয়ার। আবার বললাম, এই আর একজন সাওয়ার। এইরুপ আমরা সাতজন সাওয়ারী একত্রিত হলাম। আবূ কাতাদা (রাঃ) বলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাস্তা থেকে একটু সরে গেলেন এবং (আরাম করার জন্য) মাথা রাখলেন তারপর বললেন, তোমরা আমাদের সালাতের সময়ের লক্ষ্য রাখবে। যারা জাগলেন তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রথম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন। রোদ তার পিঠ স্পর্শ করছিল।
আবূ কাতাদা (রাঃ) বলেন, আমরা সন্ত্রস্ত অবস্থায় উঠলাম। তারপর তিনি বললেন, তোমরা আরোহন কর। আমরা আরোহন করলাম এবং চলতে লাগলাম। এমন কি সূর্য যখন উপরে উঠল, তখন তিনি অবতরণ করলেন এবং উযুর পানির পাত্র চাইলেন। তা আমার কাছে ছিল এবং তাতে অল্প পানি ছিল। আবূ কাতাদা (রাঃ) বলেন , রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই পানি থেকে ভালভাবে উযু করলেন। তিনি বলেন, তাতে কিছু পানি অবশিষ্ট রইল। তারপর আবূ কাতাদা (রাঃ) কে বললেন, তুমি আমাদের জন্য তোমার এ উযুর পাত্রটি হিফাযতে রাখ। শীগ্রই তা থেকে বিরাট ঘটনা প্রকাশ পেতে পারে। তারপর বিলাল (রাঃ) সালাতের আযান দিলেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’রাকআত সালাত আদায় করলেন। অতঃপর ফজরের দু-রাক’আত (ফরয) আদায় করলেন। অন্যান্য দিনে যেমন ভাবে আদায় করেন, আজকেও সেভাবেই আদায় করলেন।
আবূ কাতাদা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আমরা সাওয়ার হয়ে চললাম। তিনি বলেন, আমরা একে অপরকে চুপে চুপে বলতে লাগলাম, আমরা সালাতের ব্যাপারে যে ক্রটি করেছি, তার কাফফারা কি হবে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার মধ্যে কি তোমাদের জন্য আদর্শ নেই? তারপর বললেন, ঘুমের ভিতর কোন শৈথিল্য দোষ নেই।শৈথিল্য দোষ তার, যে সালাত আদায় করে না, এমন কি অন্য সালাতের সময় এসে পড়ে। কারো যদি এরুপ হয়, তবে তার উচিত সজাগ হওয়া মাত্র তা আদায় করে নেয়া। তারপর যখন দ্বিতীয়দিন আসবে, তখন যেন ঠিক সময় মত সেই সালাত আদায় করে।
তারপর বললেন লোকেরা কি করছে বলে তোমরা মনে কর? অতঃপর নিজেই বললেন, "ভোর হলে লোকেরা তাদের নবীকে দেখতে পেল না। আবূ বকর ও উমার বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিছনেই রয়েছেন। তিনি তোমাদের পেছনে ফেলে যেতে পারেন না। আর লোকেরা বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিশ্চই তোমাদের সামনে রয়েছেন। তারা আবূ বকর (রাঃ) ও উমর (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা মেনে নিলেই ঠিক করত"।
আবূ কাতাদা (রাঃ) বলেন, আমরা দুপূরের দিকে তাদের কাছে পৌছলাম। তখন সকল কিছু উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে লোকেরা বলতে লাগল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পিপাসায় আমরা মরে গেলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-বললেন, তোমরা ধ্বংস হবে না। তারপর বললেন, আমার পেয়ালাটি আন। তিনি বলেন, তারপর সেই উযূ (ওজু/অজু/অযু)র পানির পাত্রটি তলব করলেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা থেকে পানি ঢাললেন। আর আবূ কাতাদা (রাঃ) লোকদের পান করাতে লাগলেন। লোকেরা পাত্রের পানি দেখে এতই ভিড় করল যে, সকলেই একে ঘিরে বসল।
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তোমাদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখ। তোমরা সকলেই তৃপ্তি লাভ করবে। আবূ কাতাদা (রাঃ) বলেন, তারা তাই করল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানি ঢালতে লাগলেন। আর আমি তাদের পান করাতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত আমি ছাড়া আর কেউ বাদ রইল না। আবূ কাতাদা (রাঃ) বলেন, তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানি ঢেলে আমাকে বললেন, তুমি পান কর। আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি পান করার আগে আমি পান করব না। তিনি বললেন, যে লোকদের পানি পান করায় সে সকলের শেষেই পান করে। তিনি বলেন, আমি পানি পান করলাম এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পান করলেন। আবূ কাতাদা (রাঃ) বলেন, লোকেরা পানি পান করল আনন্দ ও তৃপ্তি সহকারে।
রাবী বলেন, [আবূ কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণনাকারী রাবী] আবদুল্লাহ ইবনু রাবাহ বর্ণনা করেন, আমি জামে মসজিদে এই হাদীসটি বর্ণনা করছিলাম। এমন সময় ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) বললেন, হে যুবক! তুমি ভেবে দেখ, তুমি কী বলছ। কেননা আমি সে রাতে একজন আরোহী ছিলাম। আমি বললাম, নিশ্চয়ই আপনি হাদীসটি অধিক জানেন। তিনি বললেন, তুমি কোন গোত্রের লোক? আমি বললাম, আনসার। তিনি-বললেন, তবে তুমি বর্ণনা কর। কারণ তুমি এ সম্পর্কে অবশ্য ভালই জান। তারপর আমি পূর্ণ হাদীসটি লোকদের কাছে বর্ণনা করলাম। ইমরান (রাঃ) বললেন, আমি সেই রাত্রে উপস্থিত ছিলাম; কিন্তু তুমি যেভাবে মনে রেখেছ অন্য কেউ এভাবে মনে রেখেছে বলে আমার জানা নেই।
১৪৩৬। আহমাদ ইবনু সাঈদ ইবনু সাখর আদ-দারিমী (রহঃ) ... ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কেন এক সফরে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলাম। আমরা রাতে পথ চলতে ছিলাম। যখন প্রভাতের কাছাকাছি সময় হল তখন আমরা মনযিল করলাম। আমাদের চোখ বুজে গেল এমন কি সূর্য উঠে গেল। তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে আবূ বকর (রাঃ) সর্বপ্রথম জেগে উঠলেন। আমাদের অভ্যাস ছিল যে, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমাতেন তখন তার ঘূম থেকে তাঁকে জাগাতাম না, যতক্ষন না নিজে জেগে উঠতেন। এরপর উমর (রাঃ) জেগে উঠলেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে তাকবীর দিতে লাগলেন। ফলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেগে উঠলেন। মাথা তুলে দেখতে পেলেন যে, সূর্য উদিত হয়েছে।
তিনি বললেন, তোমরা চল। তখন তিনি আমাদের নিয়ে চললেন। যখন সুর্যের আলো পরিষ্কার হয়ে গেল তখন তিনি অবতরণ করলেন এবং আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। লোকদের মধ্য থেকে একজন আলাদা রইল। সে আমাদের সঙ্গে সালাত আদায় করল না। সালাত শেষ করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন হে অমুক! কি সে তোমাকে আমার সাথে সালাত আদায় থেকে বিরত রাখল? সে বলল, ইয়া নবী আল্লাহ্, আমি জুনুবী হয়ে গেছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মাটি দ্বারা তায়াম্মুমের আদেশ করলেন। সে মাটির দ্বারা তায়ামুম করে সালাত আদায় করল।
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কয়েকজন আরোহীসহ আমাকে পানির তালাশে আগে পাঠিয়ে দিলেন। আমরা ভীষণ পিপাসার্ত হয়েছিলাম। আমরা যখন পথ চলছিলাম, তখন আমরা এক মহিলাকে দেখতে পেলাম। সে উটের পিঠে দুটি পানির মশকের মধ্যে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, পানি কোথায় আছে? সে বলল, অনেক অনেক দূরে, তোমরা পানি পাবে না। আমরা বললাম, তোমার বাড়ী থেকে পানির স্থানের দুরত্ব কতটুকু? সে বলল, একদিন ও একরাতের পথ। আমরা বললাম, তুমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে চলো। সে বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে? আমরা তার সঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে তাকে সঙ্গে নিয়ে চললাম এবং তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে নিয়ে গেলাম। তিনিও তাকে জিজ্ঞাসা করলেন। সে তাঁর কাছে সেরূপই বলল, যেমন আমাদের কাছে বলেছিল। সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এও জানাল যে, সে একজন বিধবা, তার কয়েকজন ইয়াতীম বাচ্চা রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পানি বাহক উটটি সম্পর্কে নির্দেশ দিলে সেটি বসানো হল। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মশক দুটির উপরের মুখ দুটিতে কুল্লির পানি ঢেলে দিলেন। তারপর আমরা ৪০ জন পিপাসার্ত ব্যাক্তি তৃপ্তি করে পানি পান করলাম এবং আমাদের সঙ্গে যে মশক ও পাত্র ছিল, তা ভরে নিলাম। আমাদের সে সঙ্গীটিকেও গোসলের পানি দিলাম। সেও ভালভাবে গোসল করল তবে আমাদের উটগুলোকে পানি পান করাইনি। এদিকে মশক দুটি পানিতে ফেটে পড়ার উপক্রম হচ্ছিল।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বললেন, তোমাদের সঙ্গে যার যা আছে নিয়ে এসো। আমারা তাঁর জন্য রুটি টুকরা ও খেজুর একত্রিত করলাম। আর তাঁর জন্য এগুলো একটি পোটলায় বেঁধে দেওয়া হল। মহিলাকে বললেন, তুমি যাও আর এগুলি তোমার পরিবারকে এবং তোমার ইয়াতীমদের খাওয়াও। আর জেনে রাখ, আমরা তোমার পানি কমাইনি। তারপর সে যখন তার পরিবারের কাছে এল তখন বলল, আমি আজ মানুষের মধ্যে সবচাইতে বড় যাদুকরের সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম, অথবা, তার ধারণা অনুযায়ী, তিনি নবী। তার ব্যাপার ছিল এইরূপ, এইরূপ। ফলে আল্লাহ তা’আলা সেই মহিলার বদৌলতে তার গোত্রটিকে হিদায়াত করলেন। মহিলাটি ও ইসলাম গ্রহণ করল এবং তারাও ইসলাম গ্রহণ করল।