৬৭৬০। বনূ উমাইয়ার আযাদকৃত গোলাম আবূ তাহির আহমাদ ইবনু আমর ইবনু সারহ (রহঃ) ... ইবনু শিহাব (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকের অভিযানে রওয়ানা হন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, সিরিয়ার আরব খ্রীষ্টান ও রোমকরা। ইবনু শিহাব বলেন, আমাকে আবদুর রহমান ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু কাব ইবনু মালিক (রহঃ) বলেছেন যে, আবদুল্লাহ ইবনু কাব বলেছেন, কাব ইবনু মালিক (রাঃ) অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার সন্তানদের মধ্যে তিনি ছিলেন তার চালক। আমি কাব ইবনু মালিক (রাঃ) কে তাবুক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ না করার ইতিবৃত্ত (নিজ মুখে) বর্ণনা করতে শুনেছি।
কাব ইবনু মালিক (রাঃ) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যত যুদ্ধ করেছেন তাবুক যুদ্ধ ব্যতীত এর সব কটির মধ্যেই আমি তাঁর সঙ্গে শরীক ছিলাম। তবে বদর যুদ্ধে আমি তাঁর সাথে শরীক হতে পারিনি। আর যারা (এ বছর) থেকে পশ্চাতে রয়েছে তাদের কাউকেও অভিযুক্ত করেননি। তখন তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমগণ শুধুমাত্র কুরায়শ কাফিলার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম ও কাফিরদের অনির্ধারিত সময়ে সমবেত করে দেন। আকাবার রাত্রে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের থেকে ইসলামের উপর অঙ্গীকার নিচ্ছিলেন, সে রাত্রে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। বদর যুদ্ধ যদিও মানুষের নিকট সর্বাধিক প্রসিদ্ধ, তথাপি আকাবা রজনীর পরিবর্তে বদর মুদ্ধে শরীক হওয়া আমার নিকট অধিক পছন্দনীয় নয়।
তাবুক যুদ্ধে শরীক না হওয়ার ব্যাপারে আমার ঘটনা হচ্ছে এই যে, যখন এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। তখন আমি যেমন শক্তিশালী ও স্বচ্ছল ছিলাম, তেমন আর কখনো ছিলাম না। আল্লাহর কসম! এর পূর্বে এমনকি দু’টি সাওয়ারী আমি আর কখনো একত্রে জমা করতে পারিনি। কিন্তু এ যুদ্ধের সময় দু’টি সাওয়ারীর অধিকারী ছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অভিযানে যান প্রচন্ড গরমের কালে। সফর ছিল মরু প্রান্তরের। বহু সংখ্যক শত্রুর সন্মুখীন হতে যাচ্ছিলেন। তাই তিনি বিষয়টি মুসলিমদের সামনে খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করেন, যাতে তারা যুদ্ধের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে নিতে পারে। যুদ্ধের গতিবিধি সম্পর্কেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে জানিয়ে দিলেন।
তখন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সঙ্গে মুসলিমের সংখ্যা ছিল অনেক এবং তাদের নাম লিপিবদ্ধ ছিল না কোন সংরক্ষণকারীর কিতাবে অর্থাৎ রেজিষ্টারে সংরক্ষিত ছিল না। কাব বলেন, সুতরাং যে ব্যক্তি অনুরূপ থাকতে ইচ্ছা করে সে কমপক্ষে এ ধারণা করতে পারত যে, তার অনুপস্থিতি গোপন থাকবে, যতক্ষন না আল্লাহর পক্ষ থেকে তার সম্পর্কে ওহী নাযিল হয়।
এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যখন গাছের ফল পাকছিল এবং বৃক্ষের ছায়া ছিল আনন্দদায়ক। আর আমিও ছিলাম এগুলোর প্রতি আকৃষ্ট। অবশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমগণ যুদ্বের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিলেন। আমিও তাঁদের সাথে যুদ্ধে শরীক হওয়ার জন্য প্রস্ততি গ্রহণের লক্ষ্যে বাড়ী থেকে সকালে বের হতাম, কিন্তু কোন প্রস্তুতি গ্রহণ না করেই ফিরে আসতাম এবং মনে মনে বলতাম, আমি তো যুদ্ধে যেতে সক্ষম, যখনই ইচ্ছা করি। আমার ব্যাপার এভাবেই চলতে লাগল।
এদিকে লোকজন বাস্তব প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে লাগল। অবশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যুষে রওয়ানা হলেন এবং তাঁর সঙ্গে মুসলিমগণও রওয়ানা হয়ে গেল। কিন্তু আমি কোন প্রস্তুতই গ্রহণ করি নি। পরদিন সকালে আমি বের হলাম। কিন্তু কোন প্রস্তুতি গ্রহণ না করেই ফিরে এলাম। এভাবে আমার সময় দীর্ঘায়িত হতে লাগল। এদিকে লোকজন দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয় আর মুজাহিদীনের দল বহু দুরে চলে যায়। তখন আমি ভাবতে লাগনাম যে, আমিও রওয়ানা হয়ে তাদের সাথে মিলিত হয়ে যাই। আফসোস! আমি যদি তাই করতাম। কিন্তু আমার ভাগ্যে তা হয়নি।
পরবর্তী অবস্থা হল এই যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুদ্ধে চলে যাওয়ার পর আমি যখন রাস্তায় বের হতাম তখন এ ব্যাপার আমাকে ব্যথিত করত যে, আমি অনুসরনীয় কাউকে দেখতে পেতাম না, শুধু এমন লোক যাদের উপর নিফাকের অভিযোগ রয়েছে অথবা সে সকল অক্ষম লোক যাদের আল্লাহ তাআলা মা’যুর হিসেবে অবকাশ দিয়েছেন। এদিকে তাবুক পৌছার পূর্বে রাস্তায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কথা মোটেই আলোচনা করেননি। কিন্তু তাবুক পৌছার পর লোকদের মাঝে বসা অবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, কা’ব ইবনু মালিক কি করছে? তখন বনূ সালমা গোত্রের এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! তার লাল (জোড়া) পোশাক এবং তার দেহের দু’ পাশের প্রতি দৃষ্টি তাকে বিরত রেখেছে। তখন মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) বললেন, তুমি বড় মন্দ কথা বলছ। ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহর কসম! আমরা তো তাকে ভালই জানি। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নীরব রইলেন।
ইতোমধ্যে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শুভ্র বসন পরিহিত এক ব্যক্তিকে ধূলা উড়িয়ে আসতে দেখে বললেন, আবূ খায়সামাই হবে। দেখা গেল, তিনি আনসারী সাহাবী আবূ খায়সামা (রাঃ) আর তিনি সে ব্যক্তি যিনি এক সা খেজুর সাদাকা করেছিলেন যাতে মুশরিকরা বিরূপ সমালোচনা করেছিল। কাব ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক থেকে প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার সংবাদ আমার নিকট পৌছার পর আমার উপর চিন্তার বোঝা নেমে এল। আমি মনে মনে মিথ্যা ওযর কল্পনা করতে লাগলাম এবং এমন কথা ভাবতে লাগলাম যা বলে আমি তার ক্রোধ থেকে বাচতে পারি। আর এ ব্যাপারে আমি বুদ্ধিমান আপন জনেরও সাহায্য নিতে লাগলাম।
অবশেষে যখন আমাকে বলা হল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৌছেই তখন আমার অন্তর থেকে সমস্ত বাড়িল কল্পনা দূর হয়ে গেল। এমনকি আমি অনুভব করলাম যে, কোন কিছুতেই আমি তার কাছ থেকে অব্যাহতি পাবনা। তাই আমি তার কাছে সত্য বলারই সংকল্প করে নিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভোর বেলা সফর থেকে আগমন করলেন। তাঁর অভ্যাস ছিল, সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করে প্রথমে তিনি মসজিদে আসতেন এবং তথায় দু’রাক’আত (সালাত) আদায় করে মানুষের সাথে সাক্ষাতের জন্য বসতেন। এবারও যখন তিনি বসলেন, তখন যারা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি তারা এসে অজুহাত পেশ করতে শুরু করল এবং এর উপর কসম খেতে লাগল। এ সকল লোক সংখ্যায় আশির অধিক ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রকাশ্য ওজুহাত গ্রহণ করলেন এবং তাদের থেকে বায়াআত নিয়ে তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। আর তাদের অন্তর্নিহিতা অবস্থা আল্লাহর উপর ন্যস্ত করলেন।
অবশেষে আমি উপস্থিত হয়ে সালাম করলাম। তখন তিনি ক্রুদ্ধ ব্যক্তির হাসির ন্যায় অস্পষ্ট হাসলেন। তারপর তিনি বললেন, এস। আমি এসে তাঁর সামনে বসলাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কিসে তোমাকে পশ্চাতে রেখেছিল? তুমি কি সাওয়ারী ক্রয় করনি? তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি যদি আপনি ছাড়া কোন দুনিয়াদার মানুষের নিকট বসতাম তবে আপনি দেখতেন যে অবশ্যই আমি কোন ওযর পেশ করে তার ক্রোধ থেকে বেঁচে যেতাম। কারণ আমাকে তর্কের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর কসম! আমার বিশ্বাস, আজ যদি আমি মিথ্যা কথা বলে আপনাকে আমার প্রতি রাযী করে নেই, তবে অচিরেই আল্লাহ তা*আলা আপনাকে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট করে দিবেন। আর যদি আমি সত্য কথা বলি এবং এতে আপনি আমার প্রতি অসন্তষ্ট হন, তবে এতে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি কল্যাণজনক পরিণামের আশা রাখি।
আল্লাহর কসম! আমার কোন ওযর ছিল না। আল্লাহর কসম! আপনার (অভিযান) থেকে পিছনে থাকার সময়ের তুলনায় কোন সময় আমি অধিক ক্ষমতা সম্পন্ন ও অধিক প্রাচুর্যের অধিকারী ছিলাম না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ অবশ্যই এ ব্যক্তি সত্য কথা বলেছে। তারপর তিনি বললেনঃ তুমি চলে হলও, যতক্ষননা আল্লাহ তোমার সমন্ধে ফয়সালা দেন। তারপর আমি উঠে গেলাম। তখন বনূ সালমা গোত্রের কতিপয় লোক দৌড়িয়ে আমার কাছে এসে বলল, আল্লাহর কসম! আমরা তো ইতোপূর্বে তোমাকে আর কোন অন্যায় করতে দেখিনি। যারা পশ্চাতে রয়ে গিয়েছিল, তারা যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ওযর পেশ করেছে সেভাবে ওযর পেশ করতে কি তুমি অপারগ ছিলে? অতএব, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইস্তিগফারই তোমার গুনাহের জন্য যথেষ্ট হতো।
তিনি বলেন, আল্লাহর কসম। এভাবে তারা আমাকে এত ভৎসনা করতে লাগল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আবার গিয়ে আমার নিজের উক্তি মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ইচ্ছা হতে লাগল। আমি লোকদের বললাম, আমার মত আর কারো এমন অবস্থা হয়েছে কি? তারা বলল, হ্যাঁ, আরো দুই জন তোমার মত করেছেন। তুমি যা বলেছ তারাও অনুরূপ বলেছেন এবং তোমাকে যা বলা হয়েছে তাদেরও তাই বলা হয়েছে। আমি বললাম, তারা কারা? তারা বলল, তারা হলেন, মুররা ইবনু রাবীআ আমিরী এবং হেলাল ইবনু উমায়্যা ওয়াকিফী (রাঃ)।
কা’ব বলেন, তারা আমার নিকট এমন দুই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করল, যারা ছিলেন নেককার, বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী। ঐরা দুইজনই ছিলেন অনুসরণযোগ্য। কা’ব (রাঃ) বলেন, যখন তারা ঐ দুই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করল, তখন আমি চলে গেলাম। এদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যারা যুদ্বে অংশগ্রহণ করেনি তাদের মধ্য থেকে শুধু আমাদের তিন জনের সাথে মুসলিমদের কথা বলতে নিষেধ করে দিলেন। এরপর লোকেরা আমাদের পরিহার করল অথবা বলেছেন, আমাদের সাথে তাদের ব্যবহার বদলে গেল। এমনকি যমীনও যেন পরিবর্তিত হয়ে গেল, (মনে হল) যে ভূমি আমি চিনতাম, এ যেন তা নেই। এমনি করে পঞ্চাশ রাত্র কাটালাম। আর আমার দুই সাথী ছিলেন হীনবল, তাই তারা নিজ নিজ ঘরে চুপচাপ বসে রইলেন এবং কাঁদতে লাগলেন। আর আমি তাদের মধ্যে কম বয়স্ক ও সবল ছিলাম। আমি রাস্তায় বের হতাম, সালাতে শরীক হতাম এবং বাজারেও ঘোরাফেরা করতাম। কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে কোন কথা বলতো না।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত আদায়ের পর নিজ স্থানে বসা ছিলেন, এমতাবস্থায় আমি তার নিকট এলাম, তাকে সালাম করলাম এবং মনে মনে ভাবলাম, তিনি সালামের জওয়াব প্রদান করে তার ওষ্ঠযুগল নাড়িয়েছেন কি না? তারপর আমি তাঁর নিকটে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করলাম এবং গোপন চাহনির মাধ্যমে আমি তার দিকে তাকালাম। যখন আমি সালাতে মশগুল হতাম তখন তিনি আমার প্রতি নযর দেন। কিস্তু আমি যখন তার দিকে তাকাই তখন তিনি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। আমার প্রতি মুসলিমদের এ কঠোর আচরণ যখন দীর্ঘায়িত হয়ে গেল তখন আমি গিয়ে আবূ কাতাদা (রাঃ) এর বাগানের প্রাচীরের উপর উঠলাম। তিনি ছিলেন আমার চাচাতো ভাই এবং আমার অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তি।
উপরে উঠেই আমি তাঁকে সালাম করলাম। কিন্তু আল্লাহর কসম! তিনি আমার সালামের কোন উত্তর দিলেন না। আমি তাঁকে বললাম, হে আবূ কাতাদা! আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি, তুমি কি জানো না যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ভালবাসি? তিনি কোন উত্তর দিলেন না। আমি পুনরায় তাঁকে কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। এবারও তিনি কোন উত্তর দিলেন না। তারপর আবারো আমি তাঁকে কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ই ভাল জানেন। এ কথা শুনে আমার দু’নয়ন দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। অবশেষে পিছন ফিরে আমি আবার দেয়ালের উপর চড়লাম।
তারপর আমি কোন একদিন মদীনার বাজার দিয়ে যাচ্ছিলাম, এ সময় মদীনার বাজারে শাক-সবজি বিক্রির উদ্দেশ্যে আগত সিরিয়ার কৃষকদের মধ্য থেকে একজন বলতে লাগল, আমাকে কা’ব ইবনু মালিকের ঠিকানা বলতে পারে এমন কোন ব্যক্তি আছে কি? লোকেরা ইশারায় আমাকে দেখিয়ে দিলে সে আমার নিকট আসল এবং গাসশান সম্রাটের পক্ষ হতে আমাকে একটি পত্র দিল। আমি লেখাপড়া জানতাম। তাই আমি তা পাঠ করলাম। এতে লেখা ছিল, আমি জানতে পারলাম যে, তোমার সঙ্গী মুহাম্মাদ তোমার প্রতি যুলুম করয়ে অথচ আল্লাহ পাক তোমাকে নীচু ঘরে জন্য দেননি এবং ধ্বংসের স্থানেও নয়। সুতরাং তুমি আমাদের নিকট চলে এসো। আমরা তোমার সহযোগিতা করবো।
এ পত্র পাঠমাত্র আমি বললাম এও আরেক ধরনের পরীক্ষা। তখন এ পত্রটি নিয়ে আমি উনানের নিকট গেলাম এবং উহা আগুনে জ্বালিয়ে দিলাম। চল্লিশ দিন অতিবাহিত হল। কিন্তু এদিকে কোন ওহী আসছে না। এমতাবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এক বার্তাবাহক আমার নিকট এসে বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে তোমার স্ত্রী হতে দূর হয়ে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কি তাকে তালাক দিয়ে দিব, না অন্য কিছু করব? তিনি বললেন, না তালাক দিতে হবে না। বরং তুমি তার থেকে পৃথক হয়ে যাও এবং তার সাথে সহবাস করো না। তিনি বলেন, আমার অন্য দুই সঙ্গীদের নিকটও অনুরূপ বার্তা প্রেরণ করা হল।
কা’ব (রাঃ) বলেন, অতঃপর আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, তুমি তোমার পিতার বাড়ী চলে যাও এবং যে পর্যন্ত আল্লাহ পাক এ সম্পর্কে কোন ফয়সালা না করেন ততদিন সেখানেই অবস্থান করবে। কাব (রাঃ) বলেন, তারপর হিলাল ইবনু উমায়্যা (রাঃ) এর স্ত্রী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! হিলাল ইবনু উমায়্যা একজন বৃদ্ধ-অকেজো ব্যক্তি। তার কোন খাদিম নেই। যদি আমি তার খিদমত করি, আপনি কি তা অপছন্দ করেন? তিনি বললেন, না, তবে সে তোমার সাথে সহবাস করতে পারবে না। এ কথা শুনে হিলাল (রাঃ) এর স্ত্রী বললেন, আল্লাহর কসম! (কোন ব্যাপারেই) তার মনে কোন স্পন্দন নেই এবং আল্লাহর কসম! ঐ ঘটনার পর থেকে অদ্যাবধি সে কেঁদেই দিনাতিপাত করছে।
তিনি বলেন, আমার পরিবারের কেউ কেউ বললেন, আচ্ছা তুমিও যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে অনুমতি নিয়ে নিতে। তিনি তো হিলাল ইবনু উমায়্যার স্ত্রীকে তার স্বামীর খিদমতের অনুমতি দিয়েছেন। কা’ব বলেন, আমি বললাম, আমি আমার স্ত্রীর ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করব না। কারণ আমি যুবক মানুষ। আমি আমার স্ত্রীর ব্যাপারে অনুমতি প্রার্থনা করলে না জানি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলেন। এ অবস্থায় আরো দশ রাত কাটালাম। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন থেকে আমাদের সাথে কথাবার্তা বলতে নিষেধ করেছিলেন, তখন থেকে আমাদের পঞ্চাশ রাত পূর্ণ হয়।
কাব বলেন, পঞ্চাশতম রাতের ফজরের সালাত আমি আমারর গৃহের ছাদের উপর আদায় করলাম। এরপর যখন আমি ঐ অবস্থায় বসা ছিলাম, যা আল্লাহ আমাদের ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন, অর্থাৎ আমার জীবন আমার জন্য সংকটাপন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং পৃথিবীপ্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও আমার কাছে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তখন আমি একজন ঘোষণাকারীর আওয়াজ শুনলাম, যিনি সালা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে উচ্চস্বরে বলছেন, হে কাব ইবনু মালিক! সুসংবাদ গ্রহন কর। কা’ব বলেন, তখন আমি সিজদায় লুটিয়ে পড়লাম এবং আমি বুঝতে পারলাম যে, সংকট মুক্তি এসে গেছে। কা’ব বলেন, এদিকে ফজরের সালাতের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের কাছে ঘোষণা করলেন যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওবা কবুল করেছেন।
তখনই লোকেরা আমাদের সুসংবাদ দেয়ার জন্য ছুটে চলল এবং আমার সাথীদ্বয়কে খোশখবরী পৌছানৌর জন্য কয়েকজন লোক তাদের নিকট গেলেন। আর আমার দিকে একজন ঘোড়ার উপর সাওয়ার হয়ে রওনা হলেন এবং আসলাম গোত্রের আর এক ব্যক্তিও রওনা হলেন। তিনি পাহাড়ের উপর আরোহণ করে ঘোষণা দিলেন। অশ্বের চেয়েও আওয়াজের গতি আরোদ্রুত এর তারপর যার সুসংবাদের আওয়াজ আমি শুনেছিলাম তিনি আমার নিকট আসলে আমি আমার পরিধেয় বস্ত্র দু’টো সুসংবাদের পুরস্কার স্বরূপ তাকে দিয়ে দিলাম। আল্লাহর কসম! সেদিন ঐ দু’টো কাপড় ব্যতীত আমি আর কোন কাপড়ের মালিক ছিলাম না। অতএব আমি দু’টো কাপড় ধার নিয়ে পরিধান করলাম।
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আমি রওনা দিলাম। আমার তাওবা কবুলের মুবারকবাদ জানানোর জন্য লোকেরা দলে দলে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে লাগল এবং বলতে লাগল, আল্লাহর ক্ষমা তোমার জন্য মূবারক হোক। এমতাবস্থায় আমি মসজিদে প্রবেশ করে দেখলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদেই উপবিষ্ট আছেন এবং তাঁর পাশে লোকজন রয়েছে। তখন তালহা ইবনু উবায়দুল্লাহ (রাঃ) দাঁড়ালেন এবং দৌড়ে এসে আমার সাথে মুসাফাহা করলেন এবং তিনি আমাকে মুবারকবাদ জানালেন। আল্লাহর কসম! মুহাজিরদের মধ্যে তখন তিনি ছাড়া আর কেউ (আমাকে দেখে) দাঁড়াননি।
রাবী বলেন, কা’ব তালহার এ সদাচরণের কথা ভুলেননি। কাব ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, তারপর আমি যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সালাম করলাম তখন তাঁর চেহারা খুশীতে চমকাতে ছিলো। তিনি বললেন, তোমার মা তোমাকে জন্ম দেয়ার পর থেকে যতদিন অতিবাহিত হয়েছে, তার মধ্যে তোমার জন্য এ মুবারক দিনটির সুসংবাদ। কা’ব (রাঃ) বলেন, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তা কি আপনার পক্ষ থেকে, ইয়া রাসুলাল্লাহ! না মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। তিনি বললেন, না, বরং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে।
আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খুশী হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুনারক এমনভাবে প্রদীপ্ত হতো যেন তা এক খণ্ড চাঁদ। কা’ব (রাঃ) বলেন, আমরা তাঁর চেহারা দেখেই তা বুঝতে পারতাম। তিনি বলেন, আমি যখন তাঁর সামনে বসলাম তখন বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার তাওবার শুকরিয়া হিসেবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য সাদাকা স্বরূপ দান করে আমার সমস্ত মাল থেকে মুক্ত হতে চাই। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কিছু মাল তোমার নিজের জন্য রেখে দাও। এই তোমার জন্য উত্তম। আমি বললাম, তাহলে আমি খায়বরে প্রাপ্ত অংশটুকু রেখে দিব।
কা’ব (রাঃ) বলেন, এরপর আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সত্য কথাই আমাকে মুক্তি দিয়েছে; তাই যতদিন জীবিত থাকি আমি সত্য ছাড়া বলবনা। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে সে সত্য কথা বলার পর, আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি যে অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছেন; আল্লাহ তায়াআলা আর কোন মুসলিম ব্যক্তির প্রতি এরূপ করেছেন বলে আমি জানিনা। আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে এ আলোচনা করার পর অদ্যাবধি ইচ্ছাকৃতভাবে আমি কখনো মিথ্যা কথা বলিনি। আমার আশা, অবশিষ্ট জীবনেও আল্লাহ তাআলা আমাকে মিথ্যা থেকে বাঁচিয়ে রাখবেন।
কা’ব (রাঃ) বলেন, আমার তাওবা গ্রহণযোগ্য হবার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা তখন নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেছিলেনঃ “আল্লাহ অনুগ্রহপরায়ণ হলেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা তার অনুগমন করেছিলো সংকটকালে, এমনকি যখন তাদের এক দলের চিত্ত-বৈকল্যের উপক্রম হয়েছিলো। পরে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করলেন। তিনি তাদের প্রতি দয়ার্দ্র পরম দয়ালু এবং তিনি ক্ষমা করলেন অপর তিনজনকেও, যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল, যে পর্যন্ত না পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য উহা সংকুচিত হয়েছিলো এবং তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়েছিলো এবং তারা উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন আশ্রয়স্থল নেই। পরে তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ হলেন, যাতে তারা তাওবা করে। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও। (সূরা তাওবাঃ ১১৭-১১৯)
কাব (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট সেদিন সত্য কথা বলার কারণে আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, অনুরূপ অনুগ্রহ ইসলাম গ্রহণের পর আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি আর কখনো করেননি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট সেদিন আমি মিথ্যা বলিনি। যদি বলতাম তবে অবশ্যই আমি ধ্বংস হয়ে যেতাম, যেমন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। মিথ্যাবাদীগণ। ওহী অবতরণ কালে আল্লাহ মিথ্যাবাদীদের এমন কঠোর সমালোচনা করেছেন, যা আর কাউকে করেননি। তিনি বলেছেনঃ তোমরা তাদের নিকট ফিরে এলে তারা আল্লাহর শপথ করবে, যেন তোমরা তাদের উপেক্ষা কর সুতরাং তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা করবে তারা অপবিত্র, তাদের কৃতকর্মের ফল স্বরূপ জাহান্নাম তাদের আবাস স্থল। তারা তোমাদের নিকট হলফ করবে যাতে তোমরা তাদের প্রতি তুষ্ট হও। তোমরা তাদের প্রতি তুষ্ট হলেও আল্লাহ ফাসিক (সত্যত্যাগী) লোকদের প্রতি তুষ্ট হবেন না। (সূরা তাওবাঃ ৯৫ ও ৯৬)
কা’ব (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট শপথ করার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের ওযর গ্রহণ করেছিলেন, যাদের বায়আত করেছিলেন এবং যাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন তাদের থেকে আমাদের তিনজনের বিষয়টিকে বিলম্বিত করা হয়েছিল। আল্লাহর পক্ষ থেকে ফয়সালা আসা পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বিষয়টিকে স্থগিত রেখেছিলেন। তাই আল কুরআনে আল্লাহ তায়াআলা বলেছেনঃ আর তিনি ক্ষমা করলেন অপর তিনজনকেও যাদের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল।
এখানেخلفوا “যুদ্ধ হতে আমাদের পেছনে থাকা” নয়। বরং এর অর্থ হচ্ছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক “আমাদের বিষয়টিকে স্থগিত রাখা।” ঐ লোকদের বিপরীতে যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সান্মুখে শপথ করেছিল এবং ওযর পেশ করেছিলো অতঃপর তিনি তা কবুল করেছিলেন।
মুহাম্মাদ ইবনু রাফি (রহঃ) ... ইবনু শিহাব (রহঃ) এর সুত্রে যুহরী (রহঃ) এর সুত্রে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
৬৭৬৩। হিব্বান ইবনু মূসা, ইসহাক ইবনু ইবরাহীম আল-হানযালী, মুহাম্মদ ইবনু রাফি ও আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) সাঈদ ইবনু মূসায়্যাব, উরওয়া ইবনু যুবায়র, আলকামা ইবনু ওয়াক্কাস এবং উবায়দুল্লাহ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু উতবা ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তাঁরা সকলেই আয়িশা (রাঃ) এর ঐ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন, অপবাদ রটনাকারীরা তাঁর ব্যাপারে যে অপবাদ রটনা করে বলোছিল। তারপর রটানো অপবাদ থেকে আল্লাহ তাকে নির্দোষ ঘোষণা করলেন। বর্ণনাকারী যুহরী (রহঃ) বলেন, তারা সকলেই আমার নিকট হাদীসের এক এক অংশ বর্ণনা করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ অন্যের তুলনায় উক্ত হাদীসের সুদৃঢ় হাফিয ছিলেন এবং তা উত্তমরূপে বর্ণনা করতে সক্ষম ছিলেন। তারা আমার নিকট যা বর্ণনা করেছেন, তাদের প্রত্যেকের বর্ণনা আমি যথাযথভাবে মুখস্থ করে রেখেছি। একের হাদীস অন্যের হাদীসকে সত্যায়ন করে।
তারা সকলেই আলোচনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনা আয়িশা সিদ্দীকা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরে যাওয়ার ইচ্ছা করতেন তখন তিনি তাঁর স্ত্রীদের মাঝে লটারী দিতেন। যার নাম আসত তাকেই তিনি তাঁর সঙ্গে সফরে নিতেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এক যুদ্ধ-সফরের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লটারী দিলেন এবং এতে আমার নাম উঠল। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে সে যুদ্ধে অংশ গ্রহন করি। পর্দার হুকুম নাযিল হবার পর এ যুদ্ধে আমি অংশ গ্রহন করেছিলাম। সাওয়ারী অবস্থায় আমি হাওদার ভিতরে থাকতাম এবং অবতরণ কালেও হাওদার ভিতর থাকতাম।
পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধ থেকে অব্যাহতির পর প্রত্যাবর্তন করে মদীনার নিকটবর্তী স্থানে পৌছার পর এক রাত্রে তিনি রওয়ানা হবার নির্দেশ দিলেন। লোকজন যখন রওয়ানা হবার ব্যাপারে ঘোষণা দিল, তখন আমি পথ চলতে লাগলাম; এমনকি আমি সৈন্যদেরকে ছাড়িয়ে চলে গেলাম। এরপর আমি প্রাকৃতিক প্রয়োজন (প্রস্রাব পায়খানা) সেরে সাওয়ারীর নিকট এলাম এবং স্বীয় বুকে হাত দিয়ে দেখলাম, যিফারী পুতির তৈরী আমার হারটি হারিয়ে গিয়েছে। তাই পূর্বস্থানে ফিরে গিয়ে আমি আমার হারটি তালাশ করলাম। এতে আমার বিলম্ব হয়ে গেল। এদিকে হাওদা বহনকারী লোকজন এসে হাওদা উঠিয়ে আমায় বহনকারী উটের উপর রেখে দিল। তারা মনে করেছিল আমি হাওদার ভিতরেই আছি।
আয়িশা (রাঃ) বলেন, তখনকার মহিলারা হালকা-পাতলা গড়নেরই হতো। না অধিক ভারী, না অধিক মোটা। কারণ তারা কম খাবার খেত। তাই উত্তোলনকালে হাওদার ওযন তাদের নিকট সাধারণ অবস্থা থেকে ব্যতিক্রম মনে হয়নি। অধিকন্তু তখন আমি অল্প বয়স্কা ছিলাম। অবশেষে লোকেরা উট দাঁড় করিয়ে পথ চলতে আরম্ভ করে দিল। সৈন্যদের রওয়ানা হয়ে যাবার পর আমি আমার হার পেলাম। তারপর আমি পূর্ববর্তী স্থানে ফিরে এসে দেখলাম, তথায় কোন জন-মানুষের আওয়াজ নেই আর সাড়া দেওয়ার মত কোন ব্যক্তিও তথায় নেই। তখন আমি ইচ্ছা করলাম, আমি যেখানে বসা ছিলাম সেখনেই বসে থাকব এবং আমি ভাবলাম, লোকেরা যখন খুঁজে আমাকে পাবে না তখন অবশ্যই তারা আমার সন্ধানে আমার নিকট ফিরে আসবে।
আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি আমার জায়গায়, উপবিষ্ট অবস্থায় আমার ঘুম এল আর আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সাফওয়ান ইবনু মুয়াত্তাল আস-সুলামী আয যাকওয়ানী (রাঃ) নামক এক ব্যক্তি ছিল। (বিশেষ দায়িত্ব পালনে সে) সৈন্যদের পেছনে শেষ রাত্রে সে আগের জায়গায়ই রয়ে গিয়েছিল। পরে সে রওয়ানা হয়ে প্রত্যুষে আমার স্থানে পৌছল। দূর থেকে সে একটি মানব দেহ দেখতে পেয়ে আমার নিকট এলেন এবং আমাকে দেখে সে চিনে ফেলল। কেননা পর্দার হুকুম নাযিল হওযার পূর্বে সে আমাকে দেখেছিল। আমাকে চিনে সে “ইন্না লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিঊন” পড়লে তাঁর ইন্না লিল্লাহ এর আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। তৎক্ষনাৎ আমি আমার চাদর দিয়ে স্বীয় মুখমণ্ডল আবৃত করে নিলাম। আল্লাহর কসম! সে আমার সাথে কোন কথা বলেনি এবং “ইন্না লিল্লাহ” ... পাঠ ছাড়া তার কোন কথাই আমি শুনিনি।
তারপর সে তার উট বসিয়ে স্বীয় হস্ত বিছিয়ে দিলে আমি তার উটের পৃষ্ঠে উঠলাম। আর সে পায়ে হেঁটে আমাকে সহ উট হাকিয়ে চলল। যেতে যেতে আমরা সৈন্য দলের নিকট গিয়ে পৌছলাম। তখন তারা দ্বিপ্রহরের প্রচণ্ড রোদের মাঝে সাওয়ারী থেকে অবতরণ করে ভূমিতে অবস্থান করছিল। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমার বিষয়ে যারা ধ্বংস হবার তারা ধ্বংস হয়ে গেল। এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সাহল। অবশেষে আমরা মদীনায় পৌছলাম। মদীনায় পৌছার পর এক মাস পর্যন্ত আমি অসুস্থ ছিলাম। এদিকে মদীনার লোকজন অপবাদ রটনাকারীদের কথা গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে লাগল। এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানতে পারিনি। তবে এ রুগ্ন অবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে পূর্বের ন্যায় স্নেহ না পাওয়ার ফলে আমার মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গৃহে প্রবেশ করে কেবল সালাম করে বলতেন, তোমাদের সে (আয়শা) কেমন আছে? এ আচরণ আমাকে সন্দিহান করে তুলল। আমি সে (মন্দ) বিষয়টি সমন্ধে জানতাম না। তারপর রোগ মুক্ত হবার পর আমি বের হলাম। আমার সাথে মিসতাহ এর আম্মাও ’মানাসি’ প্রান্তরের দিকে বের হল। সেটি ছিল আমাদের শৌচাগার। আমরা রাত্রে বের হতাম এবং রাত্রেই চলে আসতাম। এ হল আমাদের ঘরের কাছে শৌচাগর নির্মাণের পূর্ববর্তী সময়ের ঘটনা। তখন আগের দিনের আরব লোকদের মত ময়দানে গিয়ে আমরা শৌচকার্য সারতাম। আর আমরা ঘরের কাছে শৌচাগার নির্মাণ করা অপছন্দ করতাম।
আমি এবং মিসতাহ-এর আম্মা যেতে লাগলাম। সে ছিল আবূ রুহম ইবনু মুত্তালিব ইবনু আবদ মানাফের কন্যা এবং তার মা ছিলেন আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর খালা সাখর ইবনু আমির এর কন্যা। তার সন্তানের নাম ছিল মিসতাহ ইবনু উসাসা ইবনু আব্বাদ ইবনু মুত্তালিব। মোটকথা, আমি ও বিনতি আবূ রুহম (মিসতাহ এর আম্মা।) নিজ নিজ শৌচকার্য সেরে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলাম। এমন সময় মিসতাহ এর আম্মা নিজ চাঁদরে পেঁচ খেয়ে হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। আর সে বলে উঠে মিসতাহ ধ্বংস হোক। তখন আমি বললাম, তুমি অন্যায় কথা বলেছ। তুমি কি বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী ব্যক্তিকে মন্দ বকছ? সে বলল, হে অবলা নারী! মিসতাহ কি বলেছে তুমি কি শোননি? আমি বললাম, সে কি বলেছে?
আয়িশা (রাঃ) বলেন, তারপর সে অপবাদ রটনাকারীরা কি বলেছে, সে সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিল। এতে আমার রোগ কয়েক গুন বেড়ে গেল। আমি যখন বাড়ীতে ফিরে এলাম, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার গৃহে প্রবেশ করে আমাকে সালাম করলেন এবং বললেন, সে কেমন আছে? তখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি আমাকে আমার বাবা-মায়ের বাড়ীতে যাওয়ার অনুমতি দিবেন? আয়িশা (রাঃ) বলেন, তখন আমি আমার বাবা-মায়ের বাড়ী গিয়ে এ বিষয়টির অনুসন্ধান করার ইচ্ছা করেছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অনুমতি দিলেন। আমি আমার মাতা-পিতার নিকট চলে এলাম।
তারপর আমি আমার আম্মাকে বললাম, আব্বা জান! লোকেরা কী কথা বলছে? তিনি বললেন, মা! (এদিকে কান দিয়োনা এবং) নিজের জন্য সহজভাবে গ্রহন কর (শান্ত থাক)। আল্লাহর কসম! কারো যদি কোন সুন্দরী স্ত্রী থাকে ও সে তাকে ভালবাসে আর ঐ মহিলার কোন সতীনও থাকে তবে সতীনরা তার দোষচর্চা করবেনা এরুপ খুব কমই হয়। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এ কথা শুনে আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ! লোকেরা এ কথা রটাতে আরম্ভ করেছে? তারপর কেঁদে কেঁদে আমি সারা রাত্র কাটালাম। এমনকি ভোরেও আমার অশ্রু বন্ধ হলো না। আমি ঘুমোতে পারিনি। সকালেও আমি কাঁদছিলাম। এদিকে আমাকে তালাক দেয়ার ব্যাপারে পরামর্শ করার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) এবং উসামা ইবনু যায়িদ (রাঃ) কে ডাকলেন। তখন ওয়াহী স্থগিত ছিল।
তিনি বলেন, উসামা ইবনু যায়িদ (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিবীদের সতীত্ব এবং তাদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভালবাসা সম্পর্কে যা জানতেন সে দিকেই তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ইঙ্গিত দিলেন। তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আয়িশা আপনার স্ত্রী, ভাল ব্যতীত তাঁর সমন্ধে কোন কথাই আমাদের জানা নেই। আর আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) বললেন, আল্লাহ তো আপনার উপর কোন সংকীর্ণতা চাপিয়ে দেননি। সর্বোপরি আয়িশা (রাঃ) ছাড়াও বহু স্ত্রীলোক আছে। আপনি যদি দাসী (বারীরা) কে জিজ্ঞাসা করেন তবে সে সত্য বলে দিবে।
আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারীরা (রাঃ) কে ডেকে বললেন, হে বারীরা! সন্দেহমূলক কোন কাজে আয়িশাকে তুমি কখনো দেখেছ কি? বারীরা (রাঃ) তাঁকে বললেন, ঐ সত্তার শপথ! যিনি আপনাকে সত্য পয়গাম্বর হিসাবে প্রেরণ করেছেন, আমি যদি তার মাঝে কোন কিছু দেখতাম তবে অবশ্যই এর দোষ আমি বর্ণনা করতাম। তবে সে একজন অল্প বয়স্কা মেয়ে। পরিবারের জন্য আটার খামীর রেখেই সে ঘুমিয়ে পড়তো আর বকরী এসে তা খেয়ে ফেলতো। এ দোষ ব্যতীত অধিক কোন দোষ আয়িশার মধ্যে আছে বলে আমার জানা নেই।
তিনি বলেন, অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালূল এর আচরনের ব্যাপারে কে আমাকে সহায়তা করবে এবং শাস্তি দিলে কে আমাকে সমর্থন করবে......। তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে বললেন, হে মুসলিম সম্প্রদায়! আমার পরিবার সম্পর্কে যে ব্যক্তির পক্ষ থেকে কষ্টদায়ক কথা পৌঁছেছে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করার ব্যপারে কে আমাকে সহায়তা (সহায়তা) করবে? আমি তো (তদন্ত করে) আমার পরিবার সম্পর্কে ভাল ব্যতীত অন্য কোন কথা জানি নি এবং যে ব্যক্তি সম্পর্কে তারা অপবাদ রটনা করছে তাকেও আমি নেক্বকার বলেই জানি। সে তো আমার সঙ্গ ব্যতীত আমার গৃহে কখনো প্রবেশ করতো না।
এ কথা শুনে সা’ন ইবনু মু’আয আনসারী (রাঃ) দাঁড়ালেন এবং বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি আপনার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করব। অপবাদ রটনাকারী ব্যক্তি যদি আউস গোত্রের হয় তবে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেব। আর যদি সে আমাদের ভ্রাতা খাযরাজ গোত্রের হয় তবে আপনি আমাদের নির্দেশ দিন। আমরা আপনার নির্দেশ পালন করব। আয়িশা (রাঃ) বলেন, তখন খাযরাজ সর্দার সা’দ ইবনু উবাদা (রাঃ) দাঁড়ালেন। তিনি একজন নেককার লোক ছিলেন। তবে তখন বংশীয় অহমিকা তাকে ক্রোধে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল।
তাই তিনি সা’দ ইবনু মু’আয কে বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি তাকে হত্যা করো না। তুমি তাকে হত্যা করতে পারবেনা। একথা শুনে সা’দ ইবনু মুআয (রাঃ) এর চাচাতো ভাই উসায়দ ইবনু হুযায়র (রাঃ) দাঁড়িয়ে সা’দ ইবনু উবাদা (রাঃ) কে বললেন, তুমি মিথ্যা বলছো। আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করব। অবশ্যই তুমি মুনাফিক। তাই মুনাফিকদের পক্ষে কথা বলছো। এ সময় আউস ও খাযরাজ উভয় গোত্রের লোকেরা পরস্পর উত্তেজিত হয়ে উঠল। এমনকি তারা যুদ্ধের সংকল্প করে বসলো। অথচ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখনও তাদের সামনে মিম্বরে দাঁড়ানো অবস্থায় ছিলেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে থামিয়ে শান্ত করলেন। তারা চুপ হলো এবং তিনি নিজেও আর কোন কথা বললেন না। আয়িশা (রাঃ) বলেন, সেদিন আমি সারাক্ষণ কেঁদে কাটালাম। অবিরত ধারায় আমার অশ্রুপাত হচ্ছিল। রাত্রে একটুও আমার ঘুম আসল না। অতঃপর রাতেও আমি কেঁদে কাটালাম। এরাতেও অবিরত আমার অশ্রুপাত হল এবং একটুকুও ঘুমাতে পারলাম না। এ দেখে আমার আব্বা-আম্মা মনে করছিলেন যে, কান্নায় আমার হৃদপিন্ড বিদীর্ন হয়ে যাবে। আমি ক্রন্দনরত ছিলাম, আমার আব্বা-আম্মা আমার পাশে উপবিষ্ট ছিলেন। এমতাবস্থায় একজন আনসার স্ত্রীলোক আমার নিকট আসার অনুমতি চাইলে আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সে এসে বসে কাঁদতে লাগল।
আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমাদের যখন এ অবস্থা এমন সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট প্রবেশ করলেন এবং আমাদেরকে সালাম করে বসলেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, অথচ আমার সমন্ধে যা বলাবলি হচ্ছে তারপর থেকে তিনি আমার কাছে বসেননি। এভাবে এক মাস চলে গেল। আমার বিষয়ে তার নিকট কোন ওহী এল না। আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে তাশাহুদ পাঠ করলেন। তারপর বললেন, যা হোক হে আয়িশা! তোমার সম্পর্কে আমার নিকট এমন এমন সংবাদ পৌছেছে। যদি তুমি এ ব্যাপারে নিষ্পাপ এবং পবিত্র হও তবে আল্লাহ তাআলা তোমার পবিত্রতার ব্যাপারে ঘোষণা করবেন। আর যদি তোমার দ্বারা কোন গুনাহ হয়ে থাকে তবে তুমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা এবং তাওবা কর। কেননা বান্দা গুনাহ স্বীকার করে তাওবা করলে আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন।
আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তার কথা শেষ করলেন, তখন আমার অশ্রুপাত বন্ধ হয়ে গেল। এমনকি এরপর আর এক ফোটা অশ্রুও আমি অনুভব করলাম না। এরপর আমি আমার পিতাকে বললাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বললেন, আমার পক্ষ থেকে তার জবাব দিন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কি জবাব দিব, আমি তা জানি না। তারপর আমি আমার আম্মাকে বললাম, আমার পক্ষ থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জবাব দিন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কি জবাব দিব, আমি তা জানি না। আমি বললাম, তখন আমি ছিলাম অল্প বয়স্কা কিশোরী। কুরআন শরীফও খুব বেশী পড়িনি।
এ অবস্থা দেখে আমিই তখন বললাম, আল্লাহর কসম! আমি জানি, আপনারা এ অপবাদের কথা শুনেছেন, মনে তা গেঁখে গিয়েছে এবং আপনারা তা বিশ্বাস করে নিয়েছেন। সুতরাং এখন যদি আমি বলি, আমি নিষ্কলুষ তবে এ বিষয়ে আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন না। আর যদি আমি স্বীকার করি, যে সম্পর্কে আল্লাহ জানেন যে, আমি নিস্পাপ, তবে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন। আল্লাহর কসম! আমার ও আপনাদের জন্য (নবী) ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) এর পিতার কথার উদাহরণ ব্যতীত অন্য কোন উদাহরণ আমি খুজে পাচ্ছি না। তিনি বলেছিলেন, “সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছো সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার আশ্রয়স্থল।” এ কথা বলে আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম এবং বিছানায় শুয়ে পড়লাম।
আয়িশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! আল্লাহ তো ঐ মুহুর্তেও জানেন যে, আমি অবশ্যই নিষ্পাপ এবং অবশ্যই আল্লাহ তাআলা আমার পবিত্রতা প্রকাশ করে দিবেন। তবে আল্লাহর কসম! আমি ধারণা করিনিম যে, আল্লাহ আমার এ বিষয়ে ওয়াহী নাযিল করবেন, যা পঠিত হবে। কেননাআল্লাহ কর্তৃক আমার সমন্ধে পঠিত হবার মত কোন আয়াত নাযিল করবেন আমার নিজের কাছে আমার অবস্থা এর চেয়ে তুচ্ছতর ছিল। তবে আমি আশা করেছিলাম যে, স্বপ্নের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এমন কোন বিষয় দেখানো হবে যার দ্বারা আল্লাহ তা’আলা আমার পবিত্রতা জানিয়ে দিবেন।
আয়িশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনো তাঁর স্থান ছেড়ে উঠেননি এবং বাড়ীর লোকও কেউ বাইরে যায়নি। এ সময় আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবীর উপর ওয়াহী নাযিল করেন। ওয়াহী নাযিলের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর যে কষ্টকর অবস্থা দেখা দিত সে অবস্থা দেখা দিলো। এমনকি তার প্রতি নাযিলকৃত বাণীর ওযনের কারণে প্রচণ্ড শীতের দিনেও তার দেহ থেকে মুক্তার মত বিন্দু বিন্দু ঘাম গড়িয়ে পড়তো।
আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ কষ্টকর অবস্থা চলে গেলে তিনি হাসতে লাগলেন এবং প্রথমে যে কথাটি বললেন তা হলোঃ হে আয়িশা! সুসংবাদ গ্রহণ কর। আল্লাহ তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন। এ কথা শুনে আমার আম্মা আমাকে বললেন, তুমি উঠে তার (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে যাও। আমি বললাম, আমি উঠে তার কাছে যাব না এবং আল্লাহ ছাড়া আর কারো প্রশংসা করবো না। তিনই আমার পবিত্রতা সম্পর্কিত আয়াত নাযিল করেছেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তাআলা আমার পবিত্রতা সম্বন্ধে দশটি আয়াত নাযিল করেছেন।
"যারা অপবাদ রটনা করেছে তারা তো তোমাদেরই একটি দল একে তোমরা তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করোনা; বরং এ তো তোমাদের জন্য কল্যাণকর।" (সূরা নুরঃ ১১-২১) ...... আয়িশা (রাঃ) বলেন, আত্নীয় বন্ধন ও দারিদ্র্যের কারণে আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) মিসতাহকে আর্থিক সহযোগিতা করতেন। কিন্ত্বু আয়িশা সম্পর্কে সে যা বলেছিল সে কারণে আবূ বকর (রাঃ) কসম করে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি আর কখনো মিসতাহকে আর্থিক সাহায্য দিবনা। তখন আল্লাহ তায়ালা নাযিল করলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তারা দান করবে না আত্মীয় স্বজনকে ... ... ...। তোমরা কি চাওনা যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন, পর্যন্ত।
হিব্বান ইবনু মূসা (রহঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহঃ) বলেছেন, আল কুরআনের মাঝে এ আয়াত বড়ই আশাব্যঞ্জক। সুতরাং আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই পছন্দ করি যে, আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিন। এরপর তিনি মিসতাহ (রাঃ) এর জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতেন তা পূনরায় ব্যয় করতে আরম্ভ করলেন। আর বললেন, তাকে আমি এ অর্থ দেওয়া কখনো বন্ধ করবো না।
আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী যয়নাব বিনত জাহশ (রাঃ) কে আমার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি যয়নাবকে বলেছিলেন, তুমি আয়িশা সম্পর্কে কি জানো বা দেখেছো? উত্তরে তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আমার কান ও চোখকে রক্ষা করেছি। আল্লাহর কসম! তাঁর সম্পর্কে আমি ভাল ছাড়া কিছুই জানিনা। আয়িশা (রাঃ) বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সহধর্মিনাদের মধ্যে তিনি সমকক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ ভীতির দ্বারা আল্লাহ তাকে রক্ষা করেছেন। অথচ তার বোন হামানা বিনত জাহশ তাঁর পক্ষ অবলম্বন করে বিবাদ-বিতণ্ডা করে, আর এভাবে সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের সাথে ধ্বংস হয়ে যায়।
রাবী ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, ঐ লোকদের কাছ থেকে আমার নিকট যা পৌছেছে তা এই হাদীস। তবে রাবী ইউনূসের হাদীসের মধ্যে اجْتَملَتْهُ এর স্থলে احْتَمَلَتْهُ রয়েছে, গোত্রীয় অহমিকা তাকে উত্তেজিত করে।