২৮২১। আবূ বকর ইবনু শায়বা ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) ... হাতিম ইবন ইসমাইল জাফর ইবনু মুহাম্মাদ (রহঃ) থেকে, তিনি তার পিতার সুত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) এর কাছে গেলাম। তিনি সকলের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। অবশেষে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি বললাম, আমি মুহাম্মাদ ইবনু আলী ইবনু হুসায়ন। অতএব তিনি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে আমার মাথার উপর রাখলেন। তিনি আমার জামার উপরদিকের বোতাম খুললেন তারপর নীচের বোতাম খুললেন। তারপর তার হাত আমার বুকের মাঝে রাখলেন। আমি তখন ছিলাম যুবক। বললেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্র! তোমাকে স্বাগত জানাই, তুমি যা জানতে চাও, জিজ্ঞাসা কর। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তখন তিনি (বার্ধক্যজনিত কারণে) দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ইতিমধ্যে সালাতের ওয়াক্ত হয়ে গেল। তিনি নিজেকে একটি চাঁদর আবৃত করে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি যখনই চাঁদরের প্রান্ত নিজ কাঁধের উপর রাখতেন- তা (আকারে) ছোট হওয়ার কারণে নীচে পড়ে যেত। তার আরেকটি বড় চাঁদর তার পাশেই আলনায় রাখা ছিলো। তিনি আমাদের নিয়ে সালাতের ইমামতি করলেন।
অতঃপর আমি বললাম- আপনি আমাদেরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর (বিদায়) হাজ্জ (হজ্জ) সম্পর্কে অবহিত করুন। জাবির (রাঃ) স্বহস্তে নয় সংখ্যার প্রতি ইঙ্গিত করে বললেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নয় বছর (মদিনায়) অবস্থান করেন এবং এ সময়কালের মধ্যে হাজ্জ (হজ্জ) করেননি। অতঃপর ১০ম বর্ষে লোকদের মধ্যে ঘোষণা দেয়া হল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বছর হাজ্জে (হজ্জ) যাবেন। এবং মদিনায় বহুলোকের আগমণ হল। তাদের প্রত্যেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ করতে এবং তার অনুরূপ আমল করতে আগ্রহী ছিল।
আমরা তাঁর সঙ্গে রওনা হলাম। আমরা যখন যুল-হুলায়ফা নামক স্থানে পৌছলাম- আসমা বিনত উমায়স (রাঃ) মুহাম্মাদ ইবনু আবূ বকরকে প্রসব করলেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট লোক পাঠিয়ে জানতে চাইলেন এখন আমি কি করব? তিনি বললেন, তুমি গোসল কর, একখন্ড কাপড় দিয়ে পট্টি বেঁধে নাও এবং ইহরামের পোশাক পরিধান কর।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে (ইহরামের দু’রাকআত) সালাত আদায় করলেন। অতঃপর “কাসওয়া” নামক উষ্ট্রীতে আরোহণ করলেন। অতঃপর বায়দা নামক স্থানে তাঁর উষ্ট্রী যখন তাঁকে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল, আমি সামনের দিকে যতদূর দৃষ্টি যায়, তাকিয়ে দেখলাম লোকে লোকারন্য কতক সওয়ারীতে, কতক পদব্রজে অগ্রসর হচ্ছে। ডানদিকে, বাঁদিকে এবং পেছনেও একই দৃশ্য। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝখানে ছিলেন এবং তার উপর কুরআন নাযিল হচ্ছিল। একমাত্র তিনিই এর আসল তাৎপর্য জানেন এবং তিনি যা করতেন, আমরাও তাই করতাম। তিনি আল্লাহর তাওহীদ সম্বলিত এই তালবিয়া পাঠ করলেনঃ
লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা, লাব্বাইকা না শারীকা লাকা লাব্বাইকা, ইন্নাল-হামদা ওয়ান-নি মাতা লাকা ওয়াল মূলক, লা শারীকা লাক।
অর্থঃ আমি তোমার নিকটে হাযির আছি হে আল্লাহ, আমি তোমার নিকটে হাযির, আমি তোমার নিকটে হাযির, তোমার কোন শরীক নাই, আমি তোমার নিকটে উপস্থিত। নিশ্চিত সমস্ত প্রশংসা, নি’আমত তোমারই এবং সমগ্র রাজত্ব তোমার, তোমার কোন শরীক নেই।
লোকেরাও উপরোক্ত তালবিযা পাঠ করল যা (আজকাল) পাঠ করা হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর থেকে বেশি কিছু বলেন নাই! আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোক্ত তালবিয়া পাঠ করতে থাকলেন।
জাবির (রাঃ) বলেন, আমরা হাজ্জ (হজ্জ) ছাড়া অন্য কিছুর নিয়্যত করিনি, আমরা উমরার কথা জানতাম না। অবশেষে আমরা যখন তাঁর সঙ্গে বায়তুল্লাহ শরীফে পৌছলাম তিনি রুকন (হাজারে আসওয়াদ) স্পর্শ করলেন, তারপর সাতবার কা’বা ঘর তাওয়াফ করলেন- তিনবার দ্রুতগতিতে এবং চারবার স্বাভাবিক গতিতে। এরপর তিনি মাকামে ইবরাহীমে পৌছে এই আয়াত তিলাওয়াত করলেনঃ
وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى
অর্থঃ “তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে সালাতের স্থানরুপে গ্রহণ কর”- (সূরা বাকারাঃ ১২৫)।
তিনি মাকামে ইবরাহীমকে তাঁর ও বায়তূল্লাহর মাঝখানে রেখে (দু’রাক’আত সালাত আদায় করলেন)। (জাফর বলেন) আমার পিতা (মুহাম্মদ) বলতেন, আমি যতদুর জানি, তিনি (জাবির) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি দু-রাক’আত সালাতে সূরা ’কুল হুআল্লাহু আহাদ’ ও ’কুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফিরুন’ পাঠ করেন।
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজারে আসওয়াদের কাছে প্রত্যাবর্তন করলেন এবং তাতে চুমো খেলেন। তারপর তিনি দরজা দিয়ে সাফা পাহাড়ের দিকে বের হলেন এবং সাফার নিকটবর্তী হয়ে তিলাওয়াত করলেনঃ
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ
অর্থঃ নিশ্চয়ই সাফা-মারওইয়া আল্লাহর দুটি নিদর্শনসমূহের অন্যতম” (সূরা বাকারাঃ ১৫৮)
এবং আরো বললেন আল্লাহ তা’আলা যে পাহাড়ের উল্লেখ করে আরম্ভ করেছেন, আমিও তা দিয়ে আরম্ভ করব। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা পাহাড় থেকে শুরু করলেন এবং তারপর এতটা উপরে আরোহণ করলেন যে, বায়তুল্লাহ শরীফ দেখতে পেলেন। তিনি কিবলামুখী হলেন, আল্লাহর একত্ব ও মাহাত্ন ঘোষণা করলেন এবং বললেনঃ
"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়াহুদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া হুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু আনজাযা ওয়াহদাহু ওয়া নাসারা আবদাহ ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহু।"
অর্থঃ "আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। তাঁর জন্য রাজত্ব এবং তাঁর জন্য সমস্ত প্রশংসা, তিনি প্রতিটি জিনিসের উপর শক্তিমান। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই। তিনি এক, তিনি নিজের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন এবং তার বান্দাকে সাহায্য করেছেন ও শত্রু বাহিনীকে একাই পরাস্ত করেছেন"
তিনি এ দু’আ পড়লেন এবং তিনি অনুরূপ তিনবার বললেন। অতঃপর তিনি নেমে মারওয়া পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হলেন- যাবত না তাঁর পা উপত্যকার সমতল ভূমিতে গিয়ে ঠেকল। তিনি দ্রুত চললেন- যাবত না উপত্যকা অতিক্রম করলেন। মারওয়া পাহাড়ে উঠার সময় হেঁটে উঠলেন, অতঃপর এখানেও তাই করলেন যা তিনি সাফা পাহাড়ে করেছিলেন। সর্বশেষ তাওয়াফে যখন তিনি মারওয়া পাহাড়ে পৌছলেন, তখন (লোকদের সম্মোধন করে) বললেনঃ যদি আমি আগেই ব্যাপারটি বুঝতে পারতাম, তাহলে আমি সাথে করে কুরবানীর পশু আনতাম না এবং (হাজ্জের (হজ্জ) ইহরামকে উমরায় পরিবর্তন করতাম। অতএব তোমাদের মধ্যে যার সাথে কুরবানীর পশু নাই, সে যেন ইহরাম খুলে ফেলে এবং একে উমরায় পরিণত করে। এ সময় সুরাকা ইবনু মালিক ইবনু জু’শুম (রাঃ) দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই ব্যবস্থা কি আমাদের এ বছরের জন্য, না সর্বকালের জন্য? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতের আংগুলগুলো পরস্পরের ফাঁকে ঢূকালেন এবং দু’বার বললেন, উমরা হাজ্জের (হজ্জ) মধ্যে প্রবেশ করেছে। আরও বললেনঃ না, বরং সর্বকালের জন্য, সর্বকালের জন্য।
এ সময় আলী (রাঃ) ইয়েমেন থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য কুরবানীর পশু নিয়ে এলেন এবং যারা ইহরাম খুলে ফেলেছে, ফাতিমা (রাঃ) কে তাদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পেলেন। তিনি রঙ্গীণ কাপড় পরিহিতা ছিলেন এবং চোখে সুরমা দিয়েছিলেন। আলী (রাঃ) তা অপছন্দ করলেন। ফাতিমা (রাঃ) বললেন, আমার পিতা আমাকে এরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
রাবী বলেন, আলী (রাঃ) ইরাকে থাকতেন, অতএব ফাড়িমা (রাঃ) যা করেছেন তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে আমি তাকে জানালাম যে আমি তার এ কাজ অপছন্দ করেছি। তিনি যা উল্লেখ করেছেন, সে বিষয়ে জানার জন্য আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গেলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ফাতিমা সত্য বলেছে, সত্য বলেছে। তুমি হাজ্জের (হজ্জ) ইহরাম বাঁধার সময় কি বলেছিলে? আলী (রাঃ) বললেন আমি বলেছি, ইয়া আল্লাহ! আমি ইহরাম বাঁধলাম, যেরুপ ইহরাম বেঁধেছেন আপনার রাসুল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার সঙ্গে হাদী (কুরবানীর পশু) আছে অতএব তুমি ইহরাম খুলবে না।
জাবির (রাঃ) বলেন, আলী (রাঃ) ইয়েমেন থেকে যে পশুপাল নিয়ে এসেছেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সঙ্গে করে যে সব পশু নিয়ে এসেছিলেন, সর্বসাকুল্যে এর সংখ্যা দাঁড়াল একশত। অতএব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং যাদের সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল তারা ব্যতীত আর সকলেই ইহরাম খুলে ফেললেন এবং চুল কাটলেন। তারপর যখন তারবিয়ার দিন (৮ যিলহাজ্জ) আসল, লোকেরা পুনরায় ইহরাম বাঁধল এবং মিনার দিকে রওনা হল। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বাহনে সওয়ার হয়ে গেলেন এবং সেখানে যোহর, আসর, মাগরিব, ইশা ও ফজরের সালাত আদায় করলেন। তারপর তিনি সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন এবং নামিরা নামক স্থানে গিয়ে তার জন্য একটি তাঁবু খাটানোর নির্দেশ দিলেন এবং নিজেও রওনা হয়ে গেলেন।
কুরায়শগণ নিঃসন্দেহ ছিল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাশ’আরুল হারামের কাছে অবস্থান করবেন যেমন জাহিলী যুগে কুরায়শগণ করত। কিন্তু তিনি সামনে অগ্রসর হলেন, তারপরে আরাফাতে পৌছলেন এবং দেখতে পেলেন নামিরায় তাঁর জন্য তাঁবু খাটানো হয়েছে। তিনি এখানে অবতরণ করলেন। তারপর যখন সূর্য ঢলে পড়ল, তখন তিনি তাঁর কাসওয়া (নামক উষ্ঠী) কে প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। তার পিঠে হাওদা লাগান হল। তখন তিনি বাতনে ওয়াদীতে এলেন এবং লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেনঃ
“তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সস্পদ তোমাদের জন্য হারাম (মর্যাদাপূর্ণ) যেমন তা হারাম(মর্যাদাপূর্ণ) তোমাদের এ দিনে, তোমাদের এ মাসে এবং তোমাদের এ শহরে।”
"সাবধান! জাহিলী যুগের সকল ব্যাপার (অপসংস্কৃতি) আমার উভয় পায়ের নীচে। জাহেলী যুগের রক্তের দাবিও বাতিল হল। আমি সর্ব প্রথম যে রক্তপণ বাতিল করছি, তা হল আমাদের বংশের রবীআ ইবনু হারিসের পূত্রের রক্তপণ। সে শিশু অবস্থায় বানূ সা’দ এ দুগ্ধপোষ্য ছিল, তখন হুযায়ল গোত্রের লোকেরা তাকে হত্যা করে।
জাহেলী যুগের সুদও বাতিল হল। আমি প্রথমে যে সুদ বাতিল করছি তা হল আমাদের বংশের আব্বাস ইবনু আবদূল মুত্তালিরের সুদ। তার সমস্ত সুদ বাতিল হল।
তোমরা স্ত্রীলোকদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা তাদের আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর কালেমার মাধ্যমে তাদের লজ্জাস্থান নিজেদের জন্য হালাল করেছ। তাদের উপরে তোমাদের অধিকার এই যে, তারা যেন তোমাদের শয্যায় এমন কোন লোককে স্থান না দেয় যাকে তোমরা অপছন্দ কর। যদি তারা এরূপ করে তবে হালকাভাবে প্রহার কর। আর তোমাদের উপর তাদের ন্যায়সঙ্গত ভরণ-পোষণের ও পোশাক-পরিচ্ছেদের হুকুম রয়েছে।
আমি তোমাদের মাঝে এমন এক জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরে থাকলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব।”
“আমার সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হলে, তখন তোমরা কি বলবে?” তারা বলল, আমরা সাক্ষ্য দিব যে, আপনি (আল্লাহর বানী) পৌছিয়েছেন, আপনার হক আদায় করেছেন এবং সদুপদেশ দিয়েছেন। তারপর তিনি তর্জনী আকাশের দিকে তুলে লোকদের ইশারা করে বললেন, “ইয়া আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক, তিনি তিনবার এরূপ বললেন।
তারপর (মুআযযিন) আযান দিলেন ও ইকামত দিলেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহরের সালাত আদায় করলেন। এরপর ইকামত দিলেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসরের সালাত আদায় করলেন। তিনি এই দুই সালাতের মাঝখানে অন্য কোন সালাত আদায় করেননি।
তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ার হয়ে মাওকিফ (অবস্থানস্থল) এলেন, তাঁর কাসওয়া উষ্ট্রীর পেট পাথরের স্তুপের দিকে করে দিলেন এবং লোকদের একত্র হওয়ার জায়গা সামনে রেখে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ালেন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনি এভাবে উকুফ করলেন। হলদে আভা কিছু দূরীভূত হল, এমনকি সূর্য গোলক সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেল। তিনি উসামা (রাঃ) কে তাঁর বাহনের পেছনদিকে বসালেন এবং কাসওয়ার নাকের দড়ি সজোরে টান দিলেন, ফলে তার মাথা মাওরিক (সওয়ারী ক্লান্তি অবসাদর জন্য যাতে পা রাখে) স্পর্শ করল। তিনি ডান হাতের ইশারায় বলেন, হে জনমণ্ডলী! ধীরে সুস্থে, ধীরে সুস্থে অগ্রসর হও। যখনই তিনি বালূর স্তূপের নিকট পৌছতেন, কাসওয়ার নাকের রশি কিছুটা ঢিল দিতেন যাতে সে উপরদিকে উঠতে পারে।
এভাবে তিনি মুযদালিফায় পৌছলেন এবং এখানে একই আযানে ও দুই ইকামতে মাগরিব ও ইশার সালাম আদায় করলেন। এই সালাতের মাঝখানে অন্য কোন নফল সালাত আদায় করেননি। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুয়ে পড়লেন যাবত না ফজরের ওয়াক্ত হল। অতঃপর ভোর হয়ে গেলে তিনি আযান ও ইকামত সহ ফজরের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর তিনি কাসওয়ার পিঠে আরোহণ করে মাশ’আরুল হারাম নামক স্থানে আসলেন। এখানে তিনি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর নিকট দু’আ করলেন, তার মহাত্ব বর্ণনা করলেন, কালেমা তাওহীদ পড়লেন এবং তাঁর একত্ব ঘোষণা করলেন। দিনের আলো যথেষ্ট উজ্জ্বল না হওয়া পর্যন্ত তিনি দাঁড়িয়ে এরূপ করতে থাকলেন।
সূর্য উদয়ের পূর্বে তিনি আবার রওনা করছিলেন এবং ফযল ইবনু আব্বাস (রাঃ) সওয়ারীতে তাঁর পেছনে বসলেন।
তিনি ছিলেন যুবক এবং তার মাথার চুল ছিল অত্যন্ত সুন্দর। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন অগ্রসর হলেন- পাশাপাশি একদল মহিলাও যাচ্ছিলো। ফযল (রাঃ) তাদের দিকে তাকাতে লাগলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের হাত ফযলের চেহারার উপর রাখলেন এবং তিনি তার মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন এবং ফযল (রাঃ) অপরদিক হতে দেখতে লাগলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূনরায় অন্যদিক হতে ফযল (রাঃ) এর মূখমন্ডলে হাত রাখলেন। তিনি আবার অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখতে লাগলেন। "বাতনে মুহাসসাব" নামক স্থানে পৌঁছলেন এবং সওয়ারীর গতি কিছুটা দ্রুত করলেন। তিনি মধ্যপথে অগ্রসর হলেন যা জামরাতুল কুবরার দিকে বেরিয়ে গেছে। তিনি বৃক্ষের নিকটের জামরায় এলেন এবং নীচের খালি জায়গায় দাঁড়িয়ে এখানে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন এবং প্রত্যেকবার আল্লাহু আকবার- বললেন।
অতঃপর সেখানে থেকে কুরবানীর স্থানে এলেন এবং নিজ হাতে ৬৩ পশু যবেহ করলেন। তিনি কুরবানীর পশুতে আলী (রাঃ) কেও শরীক করলেন। অতঃপর তিনি প্রতিটি পশুর মাংসের কিছু অংশ নিয়ে একত্রে রান্না করার নির্দেশ দিলেন। অতএব তাই করা হল। তারা উভয়ে এই গোশত থেকে খেলেন এবং ঝোল পান করলেন।
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ার হয়ে বায়তুল্লাহর দিকে রওনা হলেন এবং মক্কায় পৌছে যোহরের সালাত আদায় করলেন। অতএব বনু আবদিল মূত্তালিব এর লোকদের কাছে আসলেন, তারা লোকদের যমযমের পানি পান করাচ্ছিল। তিনি বললেনঃ হে আবদুল মুত্তালিবের বংশধরগণ! পানি তোল। আমি যদি আশংকা না করতাম যে, পানি পান করানোর ব্যাপারে লোকেরা তোমাদের পরাভুত করে দেবে, তবে আমি নিজেও তোমাদের সাথে পানি তুলতাম। তখন তারা তাঁকে এক বালতি পানি দিল এবং তিনি তা থেকে কিছু পান করলেন।
৩১১৫। হান্নাদ ইবনুল সারী (রহঃ) ... আতা (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়াযীদ ইবনু মু’আবিয়ার সময় কাবাঘর দগ্ধীভূত হয়েছিল- যখন সিরীয় বাহিনী মক্কায় যুদ্ধে লিপ্ত ছিল (৬৩ হিজরী) এবং কা’বার যা হবার তাই হল। হজ্জের মৌসুমে লোকদের আগমণের সময় আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রাঃ) কাবাকে এই অবস্থায় রেখে দিলেন। তার উদ্দেশ্যে ছিল লোকদেরকে উদ্দীপ্ত করা অথবা তাদের মধ্যে সিরীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার মনোবল সৃষ্টি করা। লোকেরা সমবেত হলে তিনি বললেন, হে জনগণ! আমাকে কাবাঘর সম্পর্কে পরামর্শ দিন। আমি কি তা ভেঙ্গে ফেলে সম্পূর্ণ নতুনভাবে গড়ে তুলব, নাকি শুধু এর ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করব?
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বললেন, আমার মনে একটি মতের উদয় হয়েছে, আমি মনে করি যে, শুধু ক্ষতিগ্রস্ত অংশ তুমি মেরামত করবে এবং লোকদের ইসলাম গ্রহণ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুওয়াত লাভকালীন সময়ে কাবাঘর ও পাথরসমূহ যে অবস্থায় ছিল, তা সেই আবস্থায় রেখে দেবে। ইবনু যুবায়র (রাঃ) বললেন, আপনাদের কারো ঘর অগ্নিদগ্ধ হলে তা সংস্কার না করা পর্যন্ত তিনি স্বস্তি লাভ করতে পারেন না। অতএব আপনাদের প্রতিপালকের ঘর কি করে এরূপ জীর্ণ অবস্থায় রাখা যেতে পারে? আমি আমার রব এর কাছে তিন দিন ইস্তিখারা করব (অভিপ্রায় অবগত হওয়ার জন্য)। অতঃপর চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব। তিন দিন পর তিনি কা’বাঘর ভেঙ্গে পূনর্নির্মাণের দৃঢ় সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন।
লোকেরা আশংকা করল যে, সর্ব প্রথম যে ব্যক্তি কাবার ছাদে উঠবে, সে হয়ত কোন আসমানী গযবে নিপতিত হবে। শেষ পর্যন্ত এক ব্যক্তি (ছাদ ভাঙ্গার জন্য) কা’বার ছাদে উঠল এবং তার একটি পাথর নীচে ফেলল। লোকেরা যখন দেখল সে কোন বিপদে পড়েনি, তখন তারাও তাকে অনুসরণ করল এবং কাবাঘর ভেঙ্গে যমীনের সাথে মিশিয়ে দিল। অতঃপর ইবনু যুবায়র (রাঃ) কতগুলো থাম স্থাপন করে এগুলোর সাথে পর্দা ঝুলিয়ে দিলেন। অবশেষে কা’বার দেয়ালের গাঁথুনি উচ্চ হল।
ইবনু যুবায়র (রাঃ) বললেন, অবশ্যই আমি আয়িশা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “লোকেরা যদি নিকট অতীতে কুফরী ত্যাগ না করত এবং আমার নিকটও কাবাকে পুনর্নির্মাণ করার মত অর্থ-সামর্থ্যও নেই- তাহলে আমি অবশ্যই আল-হিজার (হাতীম) এর পাঁচ গজ স্থান কা’বা ঘরের অন্তর্ভুক্ত করতাম এবং লোকদের প্রবেশের জন্য ও বের হওয়ার জন্য এর দুটি দরজা বানাতাম।
ইবনু যুবায়র (রাঃ) বলেন, বর্তমানে আমার হাতে তা নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ আছে এবং লোকদের তরফ থেকেও কোন প্রতিবাদের আশংকা নেই। রাবী বলেন, এরপর হাতীমের পাঁচ গজ এলাকা কা’বার অন্তর্ভুক্ত করলেন। এভাবে তিনি (পুরাতন) ভিত উন্মোচন করলেন [যার উপর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তা গড়েছিলেন] এবং লোকেরা তা অবলোকন করল। এই ভিতের উপর দেয়াল গড়ে তোলা হল। কাবার দৈর্ঘ্য ছিল আঠার গজ। তা যখন (প্রস্থে) বাড়ানো হল, তখন (স্বাভাবিকভাবেই দৈর্ঘ্যে) তা ছোট হওয়ায় দৈর্ঘ্যে তা আরও দশ গজ বৃদ্ধি করা হল এবং এর দুটি দরজা নির্মাণ করা হল, একটি প্রবেশের জন্য এবং অপরটি প্রস্থানের জন্য।
ইবনু যুবায়র (রাঃ) শহীদ হলে হাজ্জাজ (ইবনু ইউসূফ) আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানকে তা লিখে জানাল। সে আরও জানাল যে, ইবনু যুবায়র (কা’বার ঘর) সেই ভিতের উপর নির্মাণ করেছে যা ছিল ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর ভিত এবং মক্কার বিশ্বস্ত লোকেরা তা যাচাই করে দেখেছে। আবদুল মালিক তাকে লিখে পাঠালেন যে, কোন বিষয়ে ইবনু যুবায়রকে অভিযুক্ত করার প্রয়োজন আমাদের নেই। সে দৈর্ঘ্যে যতইকু বর্ধিত করেছে, তা বহাল রাখ এবং হাতীমের দিকে যতটুকু বর্ধিত করেছে, তা ভেঙ্গে পূর্বাবস্থায় নিয়ে আসো। আর সে যে (নতুন) দরজা খুলেছে তা বন্ধ করে দাও। এরপর হাজ্জাজ তা ভেঙ্গে পূর্বের ভিতের উপর পুননির্মাণ করে।