রেওয়ায়ত ২. সুলায়মান ইবন ইয়াসার (রহঃ) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলয়হি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে খায়বরে প্রেরণ করিতেন। তিনি তথাকার বাগানের ফলের পরিমাণ নির্দিষ্ট করিতেন। একবার ইহুদীরা তাহাদের স্ত্রীদের অলংকার একত্রিত করিয়া আবদুল্লাহকে দিতে চাহিল আর ইহুদীরা বলিল, আপনি এই অলঙ্কার গ্রহণ করুন আর পরিমাণে কিছু হ্রাস করুন। আবদুল্লাহ বলিলেন, হে ইহুদী সম্প্রদায়! আমি আল্লাহর সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে তোমাদিগকে নিকৃষ্ট মনে করিয়া থাকি, তা সত্ত্বেও আমি তোমাদের উপর জুলুম করিতে চাহি না। তোমরা আমাকে যে উৎকোচ দিতেছ ইহা হারাম, ইহা আমরা খাই না। ইহুদীরা বলিতে লাগিল, এইজন্যই এখনও পৃথিবী ও জমি স্থির রহিয়াছে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ যদি কেহ সেচ ব্যবস্থা আঞ্জাম করিবে এই শর্তে কোন খেজুর বাগান নেয় এবং ঐ বাগানের খালি জমিতে কিছু বপন করে, তবে উহা তাহারই হইবে। যদি বাগানের মালিক এই শর্ত লাগায় যে, আমি উহাতে চাষ করিব তবে উহা বৈধ হইবে না। কেননা সেচের ব্যবস্থাপক ব্যক্তি খেজুর গাছে পানি দেবে যাহাতে তাহার জমিও সেচের আওতায় আসিয়া যাইবে আর তাহার চাষ করা অবৈধ। হ্যাঁ, যদি ঐ চাষ উভয়ের মধ্যে শরীকী হয়, তবে বৈধ হইবে যখন শ্রম, বীজ, রক্ষণাবেক্ষণ সেচ শ্রমিকের উপর থাকিবে। মালিকের শুধু জমি থাকিবে। যদি শ্রমিক জমির মালিকের উপর এই শর্ত আরোপ করে যে, আপনি বীজ দিবেন ইহা বৈধ নহে, কেননা সেচ ব্যবস্থা শুধু ঐ অবস্থায় বৈধ হইবে যখন সমস্ত কিছুই শ্রমিকের যিম্মায় থাকিবে। মালিকের শুধু জমি থাকিবে। ইহাই মুসাকাতের প্রচলিত ও বৈধ পন্থা।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ একটি কূপের দুই ব্যক্তি সমান সমান মালিক। রূপটিতে পানি রহিল না। একজন উহা ঠিক করিতে চাহিলে অন্য ব্যক্তি মানিল না, আমার নিকট টাকা নাই, আমি খরচ দিতে পারিব না। এমতাবস্থায় যে উহা ঠিক করিতে চাহিয়াছে তাহাকে উহা ঠিক করিতে দেওয়া হইবে। সমস্ত পানি তাহারই হইবে, আর সেই পানি ব্যবহারের পূর্ণ অধিকার তাহারই হইবে। অপর ব্যক্তি খরচের অর্ধেক শোধ করিলে সে তাহার অংশগ্রহণ করিবে। প্রথম ব্যক্তিকে পূর্ণ পানি এইজন্য দেওয়া হইবে যে, সে সব খরচ বহন করিয়াছে। যদি পানি না হইত তবে অপর ব্যক্তি খরচের কিছুই দিত না; প্রথম ব্যক্তির অর্থ ব্যয় বৃথা যাইত।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ যদি বাগানের মালিকের উপর সকল প্রকার ব্যয়ের দায়িত্ব থাকে, শ্রমিকের উপর ব্যয়ের কোন দায়িত্ব না থাকে, তাহার যিম্মায় থাকে কেবল শ্রম। আর তাহাকে শ্রমের পরিবর্তে কিছু ফল দেওয়া হয় তবে ইহা অবৈধ, কেননা শ্রম অনির্দিষ্ট, বাগানের মালিক তাহার পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট করিয়া না দিলে সে অবগত নহে যে তাহার পারিশ্রমিক কতটুকু । ফলের উৎপাদন বেশিও হইতে পারে, কমও হইতে পারে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি শরীকী কারবারে ধন দেয় বা সেচের বিনিময়ে বাগান শরীকানায় দেয় তাহার জন্য ইহা বৈধ নহে যে, সে নিজের জন্য অর্থ বা কতিপয় নির্দিষ্ট করে এবং বলে যে এই পরিমাণ অর্থ যেমন দশ দীনার বা অমুক অমুক গাছের ফল আমারই জন্য থাকিবে, উহাতে শরীকানা নাই, বৈধ নহে। আমাদের নিকট মাসআলা অনুরূপই।
মালিক (রহঃ) বলেন, আমাদের মধ্যে প্রচলিত নিয়মানুযায়ী বাগানের মালিক সেচ শ্রমিকের উপর নিম্নলিখিত শর্ত আরোপ করিতে পারেঃ ১। বাগানের প্রাচীর ঠিক করিতে হইবে; ২। পানির কূপ পরিষ্কার রাখিতে হইবে; ৩। বাগানের সেচের নহরগুলো পরিষ্কার রাখিবে; ৪। গাছে নর-মাদীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করিবে; ৫। ছিলা চাঁছার কাজ করিবে; ৬। গাছের খেজুর পাড়িয়া আনিবে ইত্যাদি কাজ, যদি মালিক শ্রমিক উভয়ে সম্মত হয়। গাছের মালিকের ইচ্ছাধীন থাকিবে সে শ্রমিকের জন্য অর্ধেক ফল বা কম ও বেশি যেভাবে কথা থাকে যদি উভয়ে উহাতে সম্মত থাকে নির্ধারিত করিতে পারে। গাছের মালিকের এই অধিকার থাকিবে না যে, সে শ্রমিকের প্রতি নূতন কিছু বানাইতে শর্ত করিবে যেমন কূপের চতুস্পার্শ্বে উঁচু বাধ বাধিয়া কূপ খনন করা না নূতন গাছ লাগানো বা খাল খনন করা বা এইজন্য পানির হাউজ বানানো, যাহাতে বাগানের আয় বাড়িয়া যায়।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ উহার উদাহরণ এই যে, বাগানের মালিক কাহাকেও বলিল, আমার জন্য ঘর তৈয়ার কর বা কূপ খনন কর কিংবা জলাশয় পরিষ্কার কর কিংবা অনুরূপ কোন কাজ কর যাহার পরিবর্তে আমি বাগানের অর্ধেক ফল দিয়ে দেব অথচ ফল খাওয়ার উপযুক্ত হয় নাই, না এখনও উহার পাকার সময় হইয়াছে ইহা বৈধ নহে। কেননা ইহা ফল উপযুক্ত হওয়ার পূর্বে বিক্রি করার মতো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইহা হইতে নিষেধ করিয়াছেন।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ যদি ফল খাওয়ার উপযুক্ত হয় এবং উহার বিক্রয় বৈধ হয়, সে সময় কোন ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে বলিল, তুমি আমার অমুক অমুক কাজ কর। সে কাজ নির্দিষ্ট করিয়া বলিল, তোমার কাজের বিনিময়ে আমি তোমাকে আমার এই বাগানের অর্ধেক ফল প্রদান করিব, ইহা বৈধ। কারণ এই লোকটিকে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের উপর মজুর হিসাবে গ্রহণ করা হইয়াছে; সে উহা দেখিয়া উহাতে সম্মতি প্রকাশ করিয়াছে। কিন্তু মুসাকাত বৈধ হয় যদিও বাগানের ফল উৎপন্ন না হয়, অথবা স্বল্প উৎপাদন হয় অথবা নষ্ট হইয়া যায়। মুসাকী বা সেচের ব্যবস্থাকারীর জন্য ইহাই প্রাপ্য হইবে। পক্ষান্তরে কাহাকেও শ্রমে নিযুক্ত করা হইলে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের উপর নিযুক্ত করিতে হয়, ইহা ছাড়া শ্রমে খাটানো বৈধ নহে। কারণ ইজারা এক প্রকার ক্রয়-বিক্রয়ের মতো। ইহাতে শ্রমিকের শ্রম ক্রয় করা হয়। ইহাতে ধোকার প্রবেশ ঘটিলে ইহা বৈধ হয় না। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধোকার ক্রয়-বিক্রয় হইতে নিষেধ করিয়াছেন।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের মতে প্রত্যেক প্রকার ফলের গাছের ব্যাপারে মুসাকাত জায়েয আছে। যেমন আঙ্গুর, খেজুর, যায়তুন, তীন, আনার বা শাফতাল ইত্যাদি বৃক্ষ; এই শর্তে যে, বাগানের মালিক অর্ধেক, এক-তৃতীয়াংশ, এক-চতুর্থাংশ বা বেশি-কম ফল লইয়া লইবে, অবশিষ্ট ফল শ্রমিকের থাকিবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ শস্যক্ষেত্রেও মুসাকাত বৈধ। শস্য মাটি ভেদ করিয়া বাহির ও স্থির হইলে এবং মালিক উহার যত্ন ও তত্ত্বাবধানে অক্ষম হইলে সেই অবস্থায় মুসাকাত বৈধ হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ ফল পরিপক্ক হইলে এবং বিক্রয়ের উপযুক্ত হইলে যেসব বৃক্ষে মুসাকাত জায়েষ ছিল এই ক্ষেত্রে উহা আর বৈধ হইবে না। তবে আগামী বৎসরের জন্য মুসাকাত করা যাইবে। কারণ বিক্রয়ের উপযুক্ত ফলের মুসাকাত ইজারা বলিয়া গণ্য হইবে, ইহা যেন ফল বিক্রয়ের উপযুক্ত হওয়ার পর বৃক্ষের মালিক শ্রমিকের সাথে চুক্তি করিল উহা কাটিয়া দেওয়ার জন্য, যেমন শ্রমিককে দিরহাম বা দীনার প্রদান করা হইল যাহার বিনিময়ে সে গাছের ফল কাটিয়া দিবে। ইহা মুসাকাত নহে। মুসাকাত হইতেছে বিগত বৎসর হইতে আগামী বৎসর ফল পরিপক্ক হওয়া ও বিক্রয়ের উপযুক্ত হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ের জন্য যাহা হয় তাহা।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ যে গাছের খর্জুরের উপর মুসাকাত করিয়াছে সেই গাছের ফল পরিপক্ক হওয়া এবং বিক্রয়ের উপযুক্ত হওয়ার পূর্বে এই মুসাকাত বৈধ হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ খালি জমিতে মুসাকাত বৈধ নহে। হ্যাঁ, দিরহাম দীনারের বিনিময়ে ভাড়ার উপর দেওয়া যাইতে পারে যদি কোন ব্যক্তি খালি জমি চাষের জন্য উহা হইতে উৎপাদিত এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ ফসলের উপর কাহাকেও দেয় তবে বৈধ হইবে না, কেননা উহাতে ধোঁকা রহিয়াছে। ক্ষেতে ফসল হয় কিনা তাহা জানা নাই, ফসল হইলেও কত ফসল হইবে, অধিক না অল্প তাহাও জানা নাই।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ উহার দৃষ্টান্ত এইরূপ, যেমন কোন ব্যক্তি কাহাকেও নির্দিষ্ট কিছুর বিনিময়ে সফরে তাহার সঙ্গে থাকিবার জন্য নিযুক্ত করিল। পরে তাহাকে বলিতে লাগিল, আমি এই ভ্রমণে যে লাভ করিব উহার এক-দশমাংশ তোমাকে দিব, ইহাই তোমার পারিশ্রমিক। তবে ইহা বৈধ হইবে না এবং এইরূপ করা অনুচিত। মালিক (রহঃ) বলেনঃ কাহারও জন্য নিজকে বা যমীন বা নৌকা ইত্যাদি জাতীয় কোন বস্তু যাহা তাহার নিজস্ব কিছু নির্ধারণ করা ব্যতীত কাহাকেও ভাড়ায় দেওয়া বৈধ নহে, নির্দিষ্ট করিয়া ভাড়ায় দেওয়া হইলে তাহা বৈধ।
মালিক (রহঃ) খেজুর গাছ ও খালি জমি শরীকানা ব্যবস্থায় দেওয়া সম্পর্কে বলেনঃ এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য হইল এই যে, খেজুর গাছের মালিক খেজুর খাওয়ার উপযুক্ত হওয়ার পূর্বে বিক্রয় করিতে পারে না, আর জমির মালিক জমি এই অবস্থায় দিতেছে যে উহা খালি, উহাতে কিছুই নাই।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ খেজুর বা এ জাতীয় গাছে দুই, তিন বা চার বৎসর অথবা বেশি বা কম বৎসরের জন্য সেচ ব্যবস্থার উপর দেওয়া বৈধ। খেজুর গাছের মতো অন্যান্য বৃক্ষেও ইহা বৈধ হইবে, এইরূপ আহলে ইলম-এর নিকট আমি শুনিয়াছি।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ মুসাকাতকারী বা বাগানের মালিক হইতে শ্রমিক নিজের জন্য অতিরিক্ত কিছু খাস করিয়া লইতে পারিবে না তাহা স্বর্ণ রৌপ্য হউক বা খাদ্যদ্রব্য বা অন্য কিছু হউক, ইহা জায়েয নহে। অনুরূপ শ্রমিকের পক্ষেও বাগানের মালিক হইতে নিজের জন্য অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করা বৈধ নহে। তাহা স্বর্ণরৌপ্য হউক বা খাদ্যদ্রব্য হউক — অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করা উভয়ের জন্য বৈধ নহে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ মুকারাযা বা মুসাকাতে শর্তের অধিক কিছু চাহিলে উহা ইজারা বলিয়া গণ্য হইবে। ইজারার শর্তাবলি ইহাতে প্রযোজ্য হইবে। ধোকার আশংকা রহিয়াছে এমন কিছুতে ইজারা অবৈধ। জানা নাই ফসল আদৌ হইবে কিনা বা কম হইবে, না বেশি হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ যদি কেহ এইরূপ জমি মুসাকাত ব্যবস্থার উপর দেয় যাহাতে খেজুর, আঙ্গুর বা এ জাতীয় গাছ থাকে আবার খালি জমিও থাকে। যদি জমিতে গাছ থাকে বেশি এবং খালি জমি একতৃতীয়াংশ অংশ থাকে বা উহা হইতে কম হয় তবে সেচের উপর দেওয়া বৈধ হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ যদি খালি জমি যাহাতে খেজুর বা আঙ্গুরের বৃক্ষ রহিয়াছে দুই-তৃতীয়াংশ বা ততোধিক হয় তবে এইরূপ জমি কেরায়া লওয়া বৈধ হইবে, সেচের উপর দেওয়া বৈধ হইবে না। কেননা লোকের মধ্যে এই নিয়ম রহিয়াছে যে জমিতে সেচের উপর দেওয়া হয় উহাতে খালি জায়গাও থাকে। অথবা যে তলোয়ারে চাঁদি লাগান থাকে উহাকে চাঁদির পরিবর্তে বিক্রি করিয়া দেয় কিংবা যে হার বা আংটিতে স্বর্ণ রহিয়াছে, উহাকে স্বর্ণের পরিবর্তে বিক্রি করিয়া দেয় বরাবরই মানুষ এই ধরনের কারবার করিয়া থাকে। আর ইহার কোন সীমা নির্দিষ্ট নাই যে, এই পরিমাণ হইলে বৈধ হইবে, ইহার অতিরিক্ত বৈধ হইবে না, হারাম হইবে। আমাদের মতে এই বিধান রহিয়াছে যে, যখন তলোয়ার ইত্যাদিতে বা আংটিতে স্বর্ণ ইত্যাদি এক তৃতীয়াংশ অংশের মূল্যের সমান হয় বা উহা হইতে কম হয় তবে উহা চাঁদি বা স্বর্ণের পরিবর্তে বৈধ হইবে, অন্যথায় বৈধ হইবে না।