রেওয়ায়ত ১. আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেনঃ পাঁচটির কম উটে যাকাত ওয়াজিব হয় না। পাঁচ উকিয়া হইতে কম রৌপ্য এবং পাঁচ অছক হইতে কম পরিমাণ শস্যেও যাকাত (উশর) ফরয হয় না।[1]
তাহকীক ও ব্যাখ্যা দেখুন
[1] চল্লিশদিরহামে এক উকিয়া এবং পাঁচ উকিয়ায় হয় দুইশত দিরহাম বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য। ষাট ছায়ে হয় এক অছক। আট রতলে এক ছা' এবং এক রতলে হয় প্রায় সাড়ে সাত ছটাকের মত।
রেওয়ায়ত ২. আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বর্ণনা করেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেনঃ পাঁচ আছক হইতে কম পরিমাণ খেজুরে যাকাত (উশর) নাই। পাচ উকিয়া হইতে কম পরিমাণ রৌপ্যে এবং পাঁচটির কম উটে যাকাত ফরয হয় না।
রেওয়ায়ত ৩. মালিক (রহঃ) বলেনঃ তাহার নিকট রেওয়ায়ত পৌছিয়াছে যে, উমর ইবন আবদুল আযীয (রহঃ) দামেশকে নিযুক্ত শাসনকর্তাকে লিখিয়া পাঠাইলেন-স্বর্ণ, রৌপ্য, শস্য এবং পশুপালে যাকাত ধার্য করা হইয়া থাকে
মালিক (রহঃ) বলেনঃ তিন প্রকার বস্তুতে যাকাত ধার্য হয়-ক্ষেতের শস্য, স্বর্ণ-রৌপ্য এবং পশুপালে।
রেওয়ায়ত ৪. মুহাম্মদ ইবন উকবা (রহঃ) কাসিম ইবন মুহাম্মদ (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ আমার মুকাতাব[1] চুক্তিকৃত দাসের সঙ্গে একটি বিরাট অংকের টাকার বিনিময়ে মুকতাআ[2] করিয়া ফেলিয়াছি। ইহাতেও কি যাকাত দিতে হইবে?
কাসিম (রহঃ) উত্তরে বললেন, পূর্ণ এক বৎসর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) কোন মালের যাকাত লইতেন না। কাসিম ইবন মুহাম্মদ (রহঃ) বলেন, কাহাকেও সরকারী ভাতা প্রদানের সময় আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) জিজ্ঞাসা করিয়া নিতেন, আপনার এমন ধন-সম্পদ আছে কি যাহাতে যাকাত দেওয়া ওয়াজিব হয়? ঐ ব্যক্তি স্বীকারোক্তি করিলে তিনি দেয় ভাতা হইতে ইহা কাটিয়া রাখতেন। স্বীকার না করিলে ভাতা সম্পূর্ণটাই দিয়া যেতেন। কিছুই রাখিয়া দিতেন না।
তাহকীক ও ব্যাখ্যা দেখুন
[1] কোন কিছুর বিনিময়ে আযাদ হওয়ার চুক্তি সম্পাদনকারী ক্রীতদাসকে মুকাতাব বলা হয়।
[2] চুক্তি করার সময় কিস্তিবন্দী অনুসারে টাকা দেওয়ার শর্ত হইয়াছিল কিন্তু পরে মালিকের সম্মতিতে মুকাতিব-কে দেয় মোট অংক হইতে কমে এককালীন টাকা আদায় করিয়া আযাদ হইয়া গেলে ইহাকে মুকতাআ বলা হয়।
রেওয়ায়ত ৫. আয়েশা বিনত কোদামা (রাঃ) তাহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন- তিনি বলিয়াছেনঃ বাৎসরিক ভাতা নেওয়ার জন্য উসমান ইবন আফফান (রাঃ)-এর নিকট যখন আসিতাম তখন তিনি জিজ্ঞাসা করিতেনঃ যাকাত ধার্য হওয়ার মত কোন সম্পদ আপনার নিকট রহিয়াছে কি?
আমি হ্যাঁ-সূচক জবাব প্ৰদান করিলে তিনি এই ভাতা হইতে যাকাত পরিমাণ অংক কাটিয়া রাখতেন, আর না বলিলে সম্পূর্ণ ভাতা দিয়া দিতেন।
রেওয়ায়ত ৮. রবীআ ইবন আবু আবদুর রহমান (রহঃ) হইতে একাধিকজন বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’ফুরআ’ অঞ্চলে অবস্থিত কাবালিয়া খনিসমূহ বিলাল ইবন হারিস মুযানীকে জায়গীর হিসাবে দিয়াছিলেন। এইগুলি হইতে আজ পর্যন্ত যাকাত ব্যতীত আর কিছুই লওয়া হয় না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ খনি হইতে উত্তোলিত দ্রব্যের মূল্য দুইশত দিরহাম বা বিশ দীনারের পরিমাণ না হওয়া পর্যন্ত উহাতে যাকাত ধার্য হইবে না। কিন্তু ঐ পরিমাণ হইলে উহাতে যাকাত ধার্য করা হইবে। ইহার বেশি হইলে সেই অনুপাতে যাকাত নেওয়া হইবে। খনি মাঝখানে বন্ধ হইয়া যাওয়ার পর যদি আবার চালু হয় তবে সর্বপ্রথম চালু হওয়ার সময় যেমন যাকাত ধার্য করা হইয়াছিল তেমনি ইহাতে পুনরায় যাকাত ধার্য করা হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ খনি শস্যক্ষেত্রের মতই, শস্যক্ষেত্রে যেমন ফসল উৎপন্ন হইলে উহাতে যাকাত ধার্য হয়, তেমনি খনি হইতে খনিজ দ্ৰব্য উত্তোলিত হইলে ইহা হইতে যাকাত নেওয়া হইবে। পূর্ণ এক বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার অপেক্ষা করা হইবে না।
রেওয়ায়ত ৯. আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেনঃ ভূগর্ভে প্রোথিত সম্পদে এক-পঞ্চমাংশ যাকাত ধার্য হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ বিজ্ঞ আলিমদের নিকট যাহা শুনিয়াছি এবং যাহাতে কোন দ্বিমত নাই তাহা এই— তাহারা বলিতেনঃ রিকায হইল পরিশ্রম ও টাকা ব্যয় ব্যতিরেকে হস্তগত অমুসলিম কর্তৃক ভূগর্ভে প্রোথিত সম্পদ। ইহা হস্তগত করিতে বিরাট শ্রম ও টাকার প্রয়োজন হইলে এবং কখনও কৃতকার্য কখনও অকৃতকার্য হইলে আর ইহা রিকায বলিয়া গণ্য হইবে না। ইহাতে তখন হিসাবানুসারে কেবল যাকাত ধার্য হইবে।
রেওয়ায়ত ১০. আবদুর রহমান ইবন কাসিম (রহঃ) তাহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পত্নী আয়েশা (রাঃ) তাহার ভ্রাতা মুহাম্মদ ইবন আবু বকর (রাঃ)-এর ইয়াতীম ছেলে-মেয়েদের লালন-পালন করিতেন। ইহাদের অনেকেরই অলংকার ছিল। কিন্তু আয়েশা (রাঃ) এইগুলির যাকাত আদায় করিতেন না।
রেওয়ায়ত ১১ নাফি’ (রহঃ) বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) স্বীয় কন্যা ও ক্রীতদাসীদেরকে স্বর্ণের অলংকার পরাইতেন। তিনি সমস্ত অলংকারের যাকাত দিতেন না।[1]
মালিক (রহঃ) বলেনঃ কাহারও নিকট যদি স্বর্ণ বা রৌপ্যের পিণ্ড থাকে এবং ইহা কাজে না লাগায় তবে নিসাব পরিমাণ হইলে ইহাতে বাৎসরিক চল্লিশ ভাগের এক ভাগ হারে যাকাত ধার্য হইবে। অলংকার তৈয়ারের উদ্দেশ্যে রক্ষিত পিণ্ড বা মেরামতের উদ্দেশ্যে রক্ষিত ভগ্ন অলংকার গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় মাল আসবাবের মত। ইহাতে যাকাত ফরয হইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ মোতি, কস্তুরী, আম্বর ইত্যাদি সুগন্ধি দ্রব্যে যাকাত ফরয হয় না।
তাহকীক ও ব্যাখ্যা দেখুন
[1] অধিকাংশ ইমামের নিকট ব্যবহারের উদ্দেশ্যে রক্ষিত অলংকারের যাকাত ফরয হয় না। ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)-এর মতে ইহাতেও যাকাত ফরয হইবে। আর এই হাদীসটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইয়াতীম নাবালেগদের সম্পদ ছিল বিধায় ইহার যাকাত আদায় করা হইত না।
৬. ইয়াতীমদের সম্পত্তির যাকাত এবং ইহা ব্যবসায়ে খাটান
রেওয়ায়ত ১২. মালিক (রহঃ) বলেনঃ তাহার নিকট রেওয়ায়ত পৌছিয়াছে যে, উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) বলিয়াছেনঃ ইয়াতীম পিতৃহারাদের ধন-সম্পত্তি ব্যবসায়ে খাটাও। যাকাত যেন ইহাকে গ্রাস না করিয়া ফেলে।[1]
তাহকীক ও ব্যাখ্যা দেখুন
[1] অর্থাৎ ব্যবসায়ের মাধ্যমে বৃদ্ধি না ঘটাইলে যাকাত দিতে দিতে একদিন মূল টাকা নিঃশেষ হইয়া যাইতে পারে। ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)-এর মতে ইয় সম্পত্তিতে যাকাত ওয়াজিব হয় না।
রেওয়ায়ত ১৩. কাসিম ইবন মুহাম্মদ (রহঃ) বলেনঃ আয়েশা (রাঃ) আমার ও আমার ভ্রাতাকে লালন-পালন করিতেন। আমরা উভয়েই ছিলাম ইয়াতীম। আয়েশা (রাঃ) আমাদের ধন-সম্পত্তিরও যাকাত প্রদান করিতেন।
রেওয়ায়ত ১৫. মালিক (রহঃ) বর্ণনা করেনঃ ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ (রহঃ) তাহার ইয়াতীম ভ্রাতুষ্পপুত্রদের নিমিত্ত কিছু ক্রয় করিয়াছিলেন। পরে অতি উচ্চ মূল্যে ইহা বিক্রয় করা হইয়াছিল।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ ইয়াতীমদের ওলী বা তত্ত্বাবধায়ক যদি আস্থাভাজন এবং আমানতদার হন তবে ইয়াতীমদের সম্পত্তি দ্বারা ব্যবসা করায় খারাপ কিছু নাই। ব্যবসায়ে ঘাটতি দেখা দিলে ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব তাহার উপর বর্তাইবে না।
রেওয়ায়ত ১৬. মালিক (রহঃ) বলেনঃ কেহ যদি যাকাত ফরয হওযা সত্ত্বেও তাহা আদায় না করিয়া মারা যায় তবে তাহার সাকল্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ হইতে ঐ যাকাত উসুল করা হইবে। মৃতের অসীয়ত পূরণের উপরও এই যাকাত উসুলকে প্রাধান্য দেওয়া হইবে। কেননা ইহা ঋণের মতই। আর ঋণ অসীয়ত পূরণের পূর্বে আদায় হইয়া থাকে। মৃত ব্যক্তি যাকাত আদায় করার অসীয়ত করিয়া গেলেই কেবল উল্লিখিত হুকুম হইবে। অসীয়ত না করিয়া গেলেও ওয়ারিসান যদি স্বতঃপ্রণোদিত হইয়া তাহা আদায় করিয়া দেয় তবে ভালই। কিন্তু তাহাদের জন্য ইহা করা জরুরী নহে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট সর্বসম্মত মাসআলা হইল, ওয়ারাসাত সূত্রে প্রাপ্ত ধন-সম্পত্তি, দাস-দাসী, ঘর-বাড়ি কোন কিছুরই যাকাত ওয়ারিসের উপর ধার্য হইবে না। কিন্তু কেহ যদি ঐ সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া দেয়, তবে বিক্রয়ের মূল্য হস্তগত হওয়ার পূর্ণ এক বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার পর ইহার মূল্যে যাকাত ধার্য হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেন, আমাদের নিকট গৃহীত পদ্ধতি এই যে, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ধন-সম্পত্তিতে পূর্ণ এক বৎসর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত যাকাত ওরাজিব হইবে না।
রেওয়ায়ত ১৮. আইয়ুব ইবন আবি তামীম সুখতিয়ানী (রহঃ) বর্ণনা করেন, উমাইয়া শাসকগণ অবৈধভাবে যে সমস্ত মাল কবজা করিয়া নিয়াছিলেন সে সম্পর্কে নির্দেশ দিতে যাইয়া উমর ইবন আবদুল আযীয (রহঃ) লিখিয়াছেন- প্রকৃত মালিকদের নিকট ঐগুলি ফিরাইয়া দেওয়া হউক এবং যে কয় বৎসর অতিবাহিত হইয়াছে হিসাব করিয়া সেই কয় বৎসরের যাকাত ইহা হইতে আদায় করিয়া নেওয়া হউক।পরে আরেকটি পত্রে লিখেন- এই কয় বৎসরের যাকাত যেন উসুল না করা হয়, কেননা ইহা মাল-ই-যিমারের অন্তর্ভুক্ত।[1]
তাহকীক ও ব্যাখ্যা দেখুন
[1] যিমার ; এমন সম্পদকে বলা হয় যাহা পাওয়ার আর আশা নাই। যেমন ছিনতাই হইয়া গেলে বা চোরে নিয়া গেলে। এই ধরনের সম্পদ প্রাপ্তির তারিখ হইতে পূর্ণ এক বৎসর অতিবাহিত হইলে পর যাকাত ওয়াজিব হয়।
রেওয়ায়ত ১৯. ইয়াযিদ ইবন খুসায়ফা (রহঃ) সুলায়মান ইবন ইয়াসার (রহঃ)-কে বলেনঃ এক ব্যক্তি, যাহার মাল আছে বটে কিন্তু তাহার সকল কিছুই ঋণে আবদ্ধ, তাহার কি যাকাত দিতে হইবে? সুলায়মান (রহঃ) জবাব দিলেনঃ তাহার উপর যাকাত ধার্য হইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেন, আমাদের নিকট সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হইল, উসুল না হওয়া পর্যন্ত কর্জের মধ্যে যাকাত আসে না। কয়েক বৎসর অতিবাহিত হইয়া যাওয়ার পর যদি কর্জ আদায় হইয়া আসে, তবে ইহাতে শুধু এক বৎসরের যাকাত ওয়াজিব হইবে। আদায়কৃত টাকা নিসাব পরিমাণ হইতে কম হইলে ইহাতে যাকাত ধার্য হইবে না। তবে যাকাতযোগ্য অন্য ধরনের কোন মাল-সম্পত্তি যদি তাহার থাকে তবে উহার সঙ্গে মিলিত হইয়া ইহাতেও যাকাত আসিবে। যাকাতযোগ্য অন্য কোন মাল তাহার নিকট থাকিলে আদায়কৃত টাকার হিসাব রাখা হইবে এবং দ্বিতীয়বার যাহা আদায় হইবে উহার সঙ্গে মিলিয়া যদি নিসাব পরিমাণ হয় তবে উহাতে যাকাত ধার্য হইবে। প্রথমবারে আদায়কৃত টাকা যদি বিনষ্ট হইয়া যায় আর পরে নিসাব পরিমাণ টাকা যদি উসুল হইয়া আসে তবে ইহাতেও যাকাত ধার্য হইবে। ইহার পর কম বেশি যাহাই আদায় হইবে সেই অনুপাতে যাকাতের পরিমাণও বাড়িতে থাকিবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ কয়েক বৎসরে যতটুকু পরিমাণ কর্জ উসুল হয় ইহাতে শুধু এক বৎসরেরই যাকাত দিতে হইবে। কারণ একজনের নিকট তাহার ব্যবসায়ের মাল অনেক দিন পর্যন্ত থাকে, কিন্তু যখন উহা বিক্রয় করে তখন উহার মূল্যে একবারই যাকাত ধার্য হয়। কেননা সম্পদের মালিক বা ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য অন্য সম্পদ হইতে যাকাত দিতে হয় না। এই ব্যাপারে মূলনীতি হইল, যে ধরনের সম্পদে যাকাত ওয়াজিব হইয়াছে সেই ধরনের সম্পদ যাকাতে প্রদান করা।
মালিক (রহঃ) বলেন, আমাদের নিকট ইহা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত যে, কাহারও ঋণ শোধ হইয়া যাওয়ার মত সম্পদ ছাড়াও যদি অতিরিক্ত আরও নগদ টাকা-পয়সা থাকে তবে তাহাকে উক্ত টাকার যাকাত দিতে হইবে।
টাকা এবং আসবাবপত্র মিলাইয়া যদি শুধু ঋণ পরিশোধের পরিমাণ হয় তবে ইহাতে যাকাত ওয়াজিব হইবে না। ঋণ পরিশোধের অর্থের পর যদি অতিরিক্ত আরও নগদ টাকা-পয়সা এই পরিমাণ থাকে, যে পরিমাণে যাকাত ওয়াজিব হয় তবে যাকাত দিতে হইবে।
রেওয়ায়ত ২১. আবদুল্লাহ ইবন দীনার (রহঃ) হইতে বর্ণিত, কানয সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি বলিয়াছিলেন, কানয হইল এমন ধরনের সম্পদ, যাহার যাকাত আদায় করা হয় নাই।
রেওয়ায়ত ২২. আবু হুরায়রা (রাঃ) বলিতেনঃ যে সম্পদের যাকাত আদায় করা হয় নাই, কিয়ামতের দিন সেই সম্পদ এক সাদা বর্ণের মাথাওয়ালা সাপের রূপ ধারণ করবে। উহার চোখের উপর কাল দাগ হইবে এবং আপন মালিককে খুঁজিতে থাকিবে। শেষে তাহাকে তালাশ করিয়া বাহির করিবে এবং বলিবে, আমি তোমারই সম্পত্তি, যাহার যাকাত তুমি আদায় কর নাই।
রেওয়ায়ত ২৩. মালিক (রহঃ) উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ)-এর যাকাত সম্পৰ্কীয় পত্রটি পাঠ করিয়াছিলেন। ইহাতে নিম্নরূপ বিবরণ লিখিত ছিলঃ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। যাকাত সম্পর্কে এই পত্রটি লিখিত, (পাঁচ হইতে) চব্বিশ পর্যন্ত উটে প্রতি পাঁচটিতে একটি ছাগল ধার্য হইবে। চব্বিশ হইতে পয়ত্রিশ পর্যন্ত উটে একটি এক বৎসর বয়সী উষ্ট্রী ধার্য হইবে। এক বৎসর বয়সের উষ্ট্রী না থাকিলে দুই বৎসর বয়সের একটি উষ্ট্রী গ্রহণ করা যাইবে।
পঁয়ত্রিশ হইতে পয়তাল্লিশটি পর্যন্ত দুই বৎসর বয়সের একটি উষ্ট্রী ধার্য হইবে।
পঁয়তাল্লিশ হইতে ষাট পর্যন্ত তিন বৎসর বয়সের একটি উষ্ট্রী ধার্য হইবে।
ষাট হইতে-পঁচাত্তর পর্যন্ত সংখ্যায় চার বৎসর বয়সের একটি উষ্ট্রী ধার্য হইবে।
পঁচাত্তর হইতে নব্বই পর্যন্ত সংখ্যায় দুই বছর বয়সের দুইটি উষ্ট্রী ধার্য হইবে।
নব্বই হইতে একশত বিশটি পর্যন্ত উটে তিন বৎসর বয়সের দুইটি উষ্ট্রী ধার্য হইবে।
একশত বিশের উর্ধ্বে প্রতি চল্লিশটিতে দুই বৎসর বয়সের একটি উষ্ট্রী এবং প্রতি পঞ্চাশটিতে তিন বৎসর বয়সের একটি করিয়া উষ্ট্রী ধার্য হইবে। চারণভূমিতে বিচরণরত ছাগলের সংখ্যা চল্লিশটি হইলে চল্লিশ হইতে একশত বিশ পর্যন্ত একটি বকরী ধার্য হইবে। একশত বিশ হইতে দুইশত পর্যন্ত দুইটি বকরী এবং দুইশত হইতে তিনশত পর্যন্ত তিনটি বকরী ধার্য হইবে। পরে প্রতি শতে একটি করিয়া বকরী আদায় করিতে হইবে। যাকাতের ক্ষেত্রে ছাগল গ্রহণ করা হইবে না। এমনিভাবে দোষযুক্ত এবং বৃদ্ধ পশুও ইহাতে গ্রহণ করা হইবে না। যাকাত উসুলকারী ব্যক্তি যদি ভাল মনে করেন তবে তাহা লইতে পারেন। যাকাত ধার্য হওয়ার ভয়ে পশুর বিভিন্ন দলকে একত্র বা দলকে বিভক্ত যেন করা না হয়।[1] একদল পশুতে যাহারা শরীক আছেন তাহারা যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে বরাবর হিস্যার ভাগী হইবেন। রৌপ্য পাঁচ উকিয়া পরিমাণ হইলে ইহাতে এক-চত্তারিংশ যাকাত দিতে হইবে।
রেওয়ায়ত ২৭. মালিক (রহঃ) বলেনঃ কাহারও নিকট একশত উট ছিল। যাকাত উসুলকারী তাহার নিকট আসিল না, এমনকি দ্বিতীয় বৎসরও অতিক্রান্ত হইয়া গেল। আর এই দিকে মাত্ৰ পাঁচটি উট ছাড়া তাহার বাকি সমস্ত উট মরিয়া গেল। এই অবস্থায় যাকাত উসুলকারী তাহার নিকট হইতে এই পাঁচটি উটের দুই বৎসরের যাকাত প্রতি বৎসরের একটি করিয়া বকরী দুই বৎসরের দুইটি বকরী আদায় করিবে। কারণ যাকাত আদায় করার দিন যে সম্পদ মালিকের নিকট অবশিষ্ট থাকে কেবল ইহারই যাকাত আদায় করিতে হয়। সুতরাং তাহার মালিকানাধীন পশু যদি মারা যায় বা তাহা বৃদ্ধি পায় তবে সেই অনুসারেই তাহাকে যাকাত প্রদান করিতে হইবে। যদি কয়েক বৎসরের যাকাত বকেয়া হইয়া যায় তবে যাকাত উসুলকারী ঐ ব্যক্তির নিকট মওজুদ পশুগুলির যাকাত উসুল করবে। যদি সমস্ত পশু বিনষ্ট হইয়া যায় বা বিনষ্ট হওয়ার পর যাহা অবশিষ্ট রহিল তাহা যদি নিসাব পরিমাণ না হয় তবে আর উহাতে যাকাত ধার্য হইবে না। এবং বিগত বৎসরগুলির বকেয়াও তাহাকে আদায় করিতে হইবে না।
রেওয়ায়ত ২৮. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণী আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন- উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ)-এর সম্মুখে একবার উসুলকৃত যাকাতের বকরী পেশ করা হইল। তিনি ইহার মধ্যে বড় স্তনওয়ালা একটি দুধাল বকরী দেখিতে পাইয়া বলিলেনঃ এইটি কোথা হইতে আসিল? জবাবে বলা হইল, এইটিও যাকাতের। উমর (রাঃ) বলিলেনঃ ইহার মালিক নিশ্চয়ই সস্তুষ্টচিত্তে ইহা দেয় নাই। মানুষকে তোমরা অসুবিধায় ফেলিবে না। সর্বোত্তম জিনিস কখনও যাকাতে উসুল করিবে না, আর মানুষের রিযিক ছিনাইয়া নেওয়া হইতে বিরত থাক।
মুহাম্মদ ইবন ইয়াহইয়া ইবন হাব্বান (রহঃ) বলেনঃ আশজা কবীলার দুই ব্যক্তি আমাকে বলিয়াছেন- মুহাম্মদ ইবন মাসলামা আনসারী (রাঃ) তাহাদের কবীলায় যাকাত উসুল করিতে আসিতেন এবং যাহাদের উপর যাকাত ফরয তাহাদিগকে নিজ নিজ যাকাত হাজির করিতে বলিতেন। যাকাত আদায়ে উপযুক্ত কোন বকরী হইলে তাহাই তিনি গ্রহণ করিতেন।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট ইহাই সুন্নত। আমাদের মদীনার আলিমগণকে ইহার উপরই আমল করিতে দেখিয়াছি যে, যাকাত উসুলের বেলায় মানুষের উপর কোনরূপ অসুবিধার সৃষ্টি করা উচিত নহে, বরং যাকাত প্রদানকারিগণ যাহা পেশ করে তাহা যাকাতে লওয়ার মত হইলেই কবুল করিয়া নেওয়া উচিত।
রেওয়ায়ত ২৯. আতা ইবন ইয়াসার (রহঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ পাঁচ ধরনের ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তির জন্য যাকাত গ্রহণ করা হালাল নহে। উক্ত পাঁচ ব্যক্তি হইলেন (এক) আল্লাহর পথে যুদ্ধরত মুজাহিদ, (দুই) সরকার কর্তৃক নিযুক্ত যাকাত উসুলকারী কর্মচারী, (তিন) ঋণগ্রস্ত, (চার) যে ব্যক্তি ইহা দরিদ্র ব্যক্তি হইতে খরিদ করিয়া নেয়, (পাঁচ) প্রতিবেশী কোন দরিদ্র ব্যক্তি যদি তাহাকে ইহা হাদিয়া হিসাবে প্রদান করে তবে সেই ব্যক্তি ধনী হইলেও ইহা গ্রহণ করা তাহার জন্য যায়েয হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট যাকাতের মাল বণ্টনের বিষয়টি ইসলামী সরকারের বিবেচনার উপর নির্ভরশীল। যাহারা বেশি অভাবী বা সংখ্যায় বেশি– সরকার যতদিন প্রয়োজন মনে করিবেন তাহাদিগকে দিবেন।
কিছুদিন পর অন্য কোন ধরনের লোক বেশি অভাবগ্রস্ত বা সংখ্যায় বেশি হইলে তাহাদিগকেও দিতে পারেন। মোট কথা, এই বিষয়টি হইতেছে অভাব ও সংখ্যার উপর নির্ভরশীল। আস্থাভাজন আলিমগণের নিকট হইতে আমি উল্লিখিত বক্তব্যই শুনিতে পাইয়াছি।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ যাকাত উসুলকারী কর্মচারীর জন্য নির্দিষ্ট কোন অংশ যাকাতে নাই। ইহা ইসলামী শাসনকর্তার ইখতিয়ারাধীন। যতটুকু দেওয়া উপযুক্ত মনে করিবেন তাহাই দিবেন।
১৮. যথাযথভাবে যাকাত আদায় করা এবং এই বিষয়ে কঠোরতা প্রদর্শন করা
রেওয়ায়ত ৩০. মালিক (রহঃ) বলেনঃ আবু বরক সিদ্দীক (রাঃ) বলিয়াছিলেনঃ যাকাতের বেলায় উট বাঁধার দড়িটি দিতেও যদি কেহ অস্বীকৃতি জানায় তবে তাহার সঙ্গে আমি লড়াই করিব।[1]
তাহকীক ও ব্যাখ্যা দেখুন
[1] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাত-এর পর কিছুসংখ্যক লোক যাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। তখন আবু বকর (রাঃ) এই কথা বলিয়াছিলেনঃ “উট বাঁধার দড়িটিও দিতে যদি কেউ অস্বীকৃতি জানায় তবে তাহার সঙ্গে আমি লড়াই করিব।”
রেওয়ায়ত ৩১. যায়দ ইবন আসলাম (রহঃ) বর্ণনা করেন, উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) একবার কিছু দুগ্ধ পান করেন। ইহা তাহার নিকট অত্যন্ত সুস্বাদু এবং ভাল বলিয়া মনে হইল। তিনি তখন যে ব্যক্তি দুধ পান করাইয়াছিল তাহাকে বলিলেনঃ এই দুধ কোথা হইতে আনিয়াছ? সে বলিলঃ আমি একটি জলাশয়ে গিয়াছিলাম, সেখানে যাকাতের কিছু পশু পানি পান করিতেছিল। উপস্থিত লোকেরা উহাদিগকে দুগ্ধ দোহন করিয়া আমাকেও কিছু দিল। আমি আমার পানপাত্রে উহা সংরক্ষণ করিয়া রাখিয়া দিয়াছিলাম। আপনি যাহা পান করিলেন ইহা তাহাই। উমর (রাঃ) তখন গলদেশে আঙুল প্রবেশপূর্বক উহা বমি করিয়া ফেলিয়া দিলেন।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আল্লাহ্ তা’আলা কর্তৃক নির্ধারিত কোন একটি ফরযকে যদি কেউ অস্বীকার করে আর মুসলিমগণ যদি তাহার দ্বারা উহা আদায় করাইতে না পারে তবে আদায় না করা পর্যন্ত তাহার সঙ্গে জিহাদ করা কর্তব্য।
রেওয়ায়ত ৩২. মালিক (রহঃ) বলেনঃ উমর ইবন আবদুল আযীয (রহঃ)-এর জনৈক কর্মচারী তাহাকে লিখিয়া জানাইল যে, এক ব্যক্তি স্বীয় সম্পদের যাকাত আদায় করিতে অস্বীকার করে। উমর ইবন আবদুল আযীয (রহঃ) তখন তাহাকে বলিলেনঃ ছাড়িয়া দাও। অন্যান্য মুসলিম ব্যক্তির সহিত তাহার যাকাত লইও না। যাকাত প্রদানে অনিচ্ছুক এ ব্যক্তি ইহা জানিতে পারিয়া অত্যন্ত দুঃখিত হইল এবং তাহার সম্পদের যাকাত প্রদান করার জন্য ঐ কর্মচারীর নিকট লইয়া আসিল। তখন ঐ কর্মচারী এই বিষয়ে ফয়সালা জানিতে চাহিয়া পুনরায় উমর ইবন আবদুল আযীয (রহঃ)-এর নিকট পত্র লিখিলে তিনি উত্তর দিলেনঃ তাহার যাকাত গ্রহণ করিয়া নাও।
১৯. খেজুর, আঙ্গুর- যেসব ফল অনুমান করিয়া বিক্রয় করা হয় সেসব ফলের যাকাত
রেওয়ায়ত ৩৩. সুলায়মান ইবন ইয়াসার (রহঃ) এবং বুসর ইবন সাঈদ (রহঃ) বর্ণনা করেন-রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন যে সমস্ত যমীনে বৃষ্টি বা ঝর্ণার পানি সিঞ্চিত হয় বা মূলস্থ রসই যথেষ্ট হয়, সেচের প্রয়োজন পড়ে না, সেই সমস্ত যমীনে উৎপন্ন ফসলের উশর বা এক-দশমাংশ, আর সেচ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে সমস্ত যমীন চাষ করা হয়, সেই যমীনে উৎপন্ন ফসলের নিসফেউশর বা এক-বিংশতিতমাংশ (১/২০) হারে যাকাত দিতে হয়।
রেওয়ায়ত ৩৪. ইবন শিহাব (রহঃ) বলেন, খেজুরের যাকাতে জো’রুর, মুসরানুলফার ও আজক ইবন খুবায়ক (এক ধরনের অতি নিকৃষ্ট খেজুর) গ্রহণ করা যাইবে না। তিনি বললেনঃ ইহা বকরীর যাকাতের মত। নিকৃষ্ট ধরনের বকরী গণনায় শামিল হয় বটে কিন্তু যাকাতে গ্রহণ করা যায় না। এই ক্ষেত্রেও নিকৃষ্ট ধরনের খেজুর পরিমাণের বেলায় শামিল করা হইবে বটে কিন্তু যাকাত গ্রহণ করা যাইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ ইহা বকরীর যাকাত সদৃশ। বকরীর বাচ্চা গণনায় শামিল হয় কিন্তু যাকাতে গ্রহণ করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে কোন দ্রব্য বেশি ভাল হওয়ার কারণেও যাকাতে গ্রহণ করা যায় না। যেমন বুরদী (উত্তম) জাতীয় খেজুর। মোট কথা, বেশি ভাল বা অতি নিকৃষ্ট উভয় ধরনের দ্রব্যই যাকাতে গ্রহণ করা যায় না, বরং মধ্যম ধরনের জিনিসই কেবল গ্রহণ করা যায়।
মালিক (রহঃ) বলেন, খেজুর ও আঙ্গুর ব্যতীত অন্য কোন ফলের বেলায় খারস বা বৃক্ষস্থ ফলের পরিমাণ অনুমান করিয়া তদানুযায়ী যাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ করা যাইবে না। খেজুর ও আঙ্গুর প্রায় পরিপক্ক হইয়া উঠিলে এবং বিক্রয় করা যায় এমন অবস্থায় পৌছিলে উহাতে অনুমান করা যায়, কারণ খেজুর ও আঙ্গুর উভয় ধরনের ফল কাঁচা অশুষ্ক অবস্থায়ও খাওয়া যায়। সুতরাং পাকা ও শুষ্ক হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হইলে ইহাতে মানুষের অসুবিধার সৃষ্টি হইবে। অতএব সাধারণ মানুষের সুবিধার প্রতি লক্ষ করিয়া বৃক্ষস্থ খেজুর ও আঙ্গুরের পরিমাণ অনুমান করার পর মালিককে তাহার কলের অধিকার সহ ছাড়িয়া দেওয়া হইবে। যেভাবে মনে করে সে উহা ভোগ করবে এবং পরে পূর্বের অনুমানকৃত পরিমাণানুসারে যাকাত প্ৰদান করবে।
মালিক (রহঃ) বলেন, যে সমস্ত ফল কাঁচা ভক্ষণ করা হয় না, বরং কর্তনের পর বিশেষ প্রক্রিয়ায় ভক্ষণ করা হয়, যেমন- ধান, গম ইত্যাদি যাবতীয় শস্যের বেলায় ক্ষেতে শস্য রাখিয়া ক্ষেত্রস্থ শস্যের পরিমাণ অনুমান করিয়া নির্ণয় করিবার পর যাকাত নির্ধারণ করা যাইবে না। শস্য কর্তনের পর মাড়ানো এবং পরিষ্কার করা হইলে উহাতে যাকাত আদায় করিতে হয়। যাকাত ধার্য করার মত না হওয়া পর্যন্ত উহা মালিকের হাতে আমানত হিসাবে থাকে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ উক্ত বিষয়ে আমাদের মধ্যে কোন মতানৈক্য নাই। মালিক (রহঃ) বলেন, আমাদের নিকট সর্বসম্মত মাস’আলা হইল, ফল প্রায় পরিপক্ক অবস্থায় যখন বিক্রয়ের উপযুক্ত হইবে তখন উহাতে অনুমান করিয়া বৃক্ষস্থ ফলের পরিমাণ নির্ণয় করা হইবে এবং কর্তনের পর উহার যাকাতের পরিমাণ অনুসারে বিশুদ্ধ খেজুর লওয়া হইবে। অনুমান করিয়া পরিমাণ নির্ধারণের পর কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের দরুন যদি বৃক্ষস্থ সমস্ত খেজুর বিনষ্ট হইয়া যায়, তবে আর উহাতে যাকাত ধার্য হইবে না। বিনষ্ট হওয়ার পরও যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম এর ব্যবহৃত হয়ে পাঁচ আছক (ষাট ছা’) পরিমাণ খেজুর অবশিষ্ট থাকে তবে ইহাতে যাকাত ধার্য হইবে, আর যতটুকু পরিমাণ বিনষ্ট হইয়া গিয়াছে উহাতে যাকাত ধার্য হইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আজুরের বেলায়ও উক্ত হুকুম প্রযোজ্য হইবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ বিভিন্ন স্থানে যদি কাহারও জায়গীর বা অংশ থাকে আর সবগুলিকে একত্র করিলে যাকাত পরিমাণ হয় তবে আলাদা আলাদাভাবে যাকাত পরিমাণ না হইলেও উহাতে যাকাত ধার্য করা হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেন, এই বিষয়ে আমাদের নিকট সর্বসম্মত সুন্নত এবং আহলে ইলমদের নিকট যাহা শুনিয়াছি তাহ এই ফল-ফলাড়ি যথা পীচ, ডুমুর অথবা অদ্রপ অন্যান্য ফল অথবা এইগুলির মত না হইলেও যাহা ফল বলিয়া গণ্য, ইহাদের উপর যাকাত ধার্য হয় না। একইভাবে শাক-সবজি, তরিতরকারি ইত্যাদির উপর যাকাত ধার্য হয় না এবং এইগুলির বিক্রয়লব্ধ অর্থের উপরও যাকাত নাই। তবে বিক্রয়লব্ধ অর্থ মালিকের হাতে আসার পর তাহার নিকট এক বৎসর থাকিলে উহার উপর যাকাত ধার্য হইবে।
রেওয়ায়ত ৩৭. আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলিয়াছেনঃ মুসলিম ব্যক্তির দাস-দাসী এবং ঘোড়ার যাকাত ধার্য হয় না।
রেওয়ায়ত ৩৮. সুলায়মান ইবন ইয়াসার (রহঃ) বর্ণনা করেন- সিরিয়াবাসিগণ আবূ উবায়দা ইবন জাররাহ (রাঃ)-এর নিকট তাহাদের ঘোড়া বা দাস-দাসীদের যাকাত নেওয়ার কথা বলিলে তিনি তাহা গ্রহণ না করিয়া উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ)-কে জানাইলেন। উমর (রাঃ)-ও উহা গ্রহণ করিতে অস্বীকৃতি জানাইলেন। পরে তাহারা আবূ উবায়দা (রাঃ)-এর নিকট তাহাদের ঘোড়া ও দাস-দাসীদের যাকাত গ্রহণ করিতে পুনরায় অনুরোধ জানাইলে তিনি আবার উমর (রাঃ)-এর নিকট এই সম্পর্কে লিখিয়া জানাইলেন। উমর (রাঃ) তাহাকে উত্তরে লিখিলেনঃ স্বেচ্ছায় যদি তাহারা এইগুলির যাকাত দিতে চায় তবে উহা গ্রহণ করুন এবং উহা দরিদ্র ও দাস-দাসীদের মধ্যে বন্টন করিয়া দিন।
রেওয়ায়ত ৩৯. আবদুল্লাহ ইবন আবু বকর ইবন হাযম (রহঃ) বলেনঃ মীনায় অবস্থানকালে আমার পিতা আবু বকর ইবন হাযমের নিকট উমর ইবন আবদুল আযীয (রহঃ)-এর একটি পত্র আসিয়াছিল। ইহার মর্ম ছিলঃ মধু এবং ঘোড়ার যাকাত আপনি গ্রহণ করিবেন না।
রেওয়ায়ত ৪০. আবদুল্লাহ ইবন দীনার (রহঃ) বলেনঃ আমি সাঈদ ইবন মুসায়্যাব (রহঃ)-কে তুর্কী ঘোড়ার যাকাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেনঃ ঘোড়ায়ও আবার যাকাত হয় নাকি?
রেওয়ায়ত ৪২. মুহাম্মদ বাকির (রহঃ) বর্ণনা করেন, উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) অগ্নি উপাসকদের জিযয়ার কথা আলোচনা করিতে গিয়া বলিলেনঃ বুঝিতে পারিতেছি না, ইহাদের ব্যাপারে কি করা যায়। এই সময় আবদুর রহমান ইবন আউফ (রাঃ) বললেনঃ আমি সাক্ষ্য দিতেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে আমি বলিতে শুনিয়াছি যে, অগ্নি-উপাসকদের সহিত তোমরা কিতাবীদের মত ব্যবহার করিবে।
রেওয়ায়ত ৪৩. আসলাম (রাঃ) বর্ণনা করেন, উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) অমুসলিম স্বর্ণ মালিকদের উপর বাৎসরিক চার দীনার এবং রৌপ্য-মালিকদের উপর বাৎসরিক দশ দিরহাম জিযয়া ধার্য করিয়াছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুধার্ত মুসলিমদের খাদ্য প্রদান এবং মুসাফিরদের তিনদিন পর্যন্ত মেহমানদারী করাও ইহার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
রেওয়ায়ত ৪৪. আসলাম (রহঃ) বর্ণনা করেন- উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ)-কে একবার জানাইলাম, সরকারী উটসমূহের মধ্যে একটা অন্ধ উটও রহিয়াছে। উমর (রাঃ) বলিলেনঃ অভাবী কাহাকেও দিয়া দিও। ইহা হইতে সে উপকার লাভ করিতে পারিবে। আমি বলিলামঃ উটটি তো অন্ধ। তিনি বলিলেন, উহাকে উটের দলে বাধিয়া দিবে। ইহাদের সঙ্গে চলাফেরা করিবে। আমি বলিলাম, কেমন করিয়া ইহা ঘাস খাইবে? তিনি বলিলেনঃ ইহা জিযয়া না যাকাতের? আমি বলিলামঃ জিয়ার। তিনি বলিলেনঃ তুমি ইহাকে যবেহ করার ইচ্ছা করিয়াছ নাকি? আমি বলিলামঃ না, ইহাতে জিযয়ার চিহ্ন বিদ্যমান। শেষে উমর (রাঃ)-এর নির্দেশে ঐ উটকে নাহর (যবেহ) করা হইল। উমর (রাঃ)-এর নিকট নয়টি পেয়াল ছিল। ফল বা ভাল কোন জিনিস তাহার নিকট আসিলে ঐ পেয়ালাগুলি ভরিয়া উম্মুল মু’মিনীনদের নিকট পাঠাইয়া দিতেন। সকলের শেষে তদীয় কন্যা উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রাঃ)-এর নিকট পাঠাইতেন। কম পড়িলে হাফসা (রাঃ)-এর হিস্যাতেই পড়িত। যাহা হউক, উক্ত অন্ধ উটটিকে নাহর করার পর প্রথম উল্লিখিত পেয়ালাসমূহ ভরিয়া উম্মুল মুমিনীনদের নিকট পাঠানো হইল। বাকি যাহা রহিল তাহা রান্না করিয়া মুহাজির ও আনসারদেরকে দাওয়াত করিয়া খাওয়াইলেন।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ অমুসলিম জিযয়া প্রদানকারীদের নিকট হইতে জিযয়া হিসাবে পশু আদায় করা হইবে না। তবে মূল্য ধার্য করিয়া নগদ অর্থের বদলে পশু লওয়া যাইতে পারে।
রেওয়ায়ত ৪৫. মালিক (রহঃ) বলেন, আমি জানিতে পারিয়াছি যে, উমর ইবন আবদুল আযীয (রহঃ) তাহার কর্মচারীদের নিকট একই মর্মে চিঠি লিখিয়াছেন যে, জিযয়া প্রদানকারীদের মধ্যে যাহারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিবে তাহদের জিযয়া মওকুফ হইয়া যাইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ প্রচলিত সুন্নত হইল, অমুসলিম আহলে কিতাব নারী ও শিশুদের উপর জিযয়া ধার্য হইবে না। যুবকদের নিকট হইতেই কেবল জিযয়া আদায় করা হইবে।
মালিক (রহঃ) বললেনঃ যিম্মী ও অগ্নিপূজকদের খেজুর বা আঙ্গুরের বাগান, কৃষিক্ষেত্র এবং পশুসমূহ হইতে যাকাত গ্রহণ করা হইবে না। কারণ সম্পদ পবিত্রকরণ উদ্দেশ্যে এবং মুসলিম দরিদ্র ব্যক্তিগণকে প্রদানের জন্য যাকাত শুধু মুসলিমদের উপর ধার্য হয়। জিযয়া অমুসলিম বাসিন্দাদেরকে অধঃস্থ দেখাইবার জন্য কেবল তাহাদের উপর ধার্য করা হইয়াছে। সুতরাং যতদিন তাহারা সন্ধিকৃত এলাকায় বসবাস করিবে, তাহাদের উপর জিযয়া ব্যতীত আর কিছুই ধার্য হইবে না। তবে মুসলিম অধুষিত অঞ্চলে তাহারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে আসা-যাওয়া করিলে তাহাদের ব্যবসায়ের মাল হইতে এক-দশমাংশ আদায় করা হইবে। কারণ স্বীয় অঞ্চলে বসবাস করার এবং শক্ৰ হইতে রক্ষা করার ভিত্তিতেই তাহাদের উপর জিযয়া ধার্য করা হইয়াছিল। সুতরাং স্বীয় অঞ্চলের বাহিরে গিয়া ব্যবসায়ে লিপ্ত হইলে ব্যবসায়ের মাল হইতে এক-দশমাংশ আদায় করা হইবে। যেমন মিসরে বসবাসকারী অমুসলিম বাসিন্দা সিরিয়ায়, সিরিয়ার যিম্মী ইরাকে, ইরাকের যিম্মী অধিবাসী মদিনায় ব্যবসা করিতে গেলে তাহার ব্যবসায়ের মালে এক-দশমাংশ কর ধার্য করা হইবে। আহলে কিতাব এবং অগ্নি-উপাসক (অর্থাৎ অমুসলিম যিম্মী) বাসিন্দাদের পশুপাল, ফল এবং কৃষিক্ষেত্রে কোনরূপ যাকাত ধার্য করা যাইবে না। এমনিভাবে অমুসলিম যিম্মী নাগরিকদিগকে তাহাদের পৈতৃক ধর্মে প্রতিষ্ঠিত থাকিতে দেওয়া হইবে এবং তাহদের ধর্মীয় বিষয়ে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করা যাইবে না। কিন্তু দারুল ইসলামে যতবার তাহারা ব্যবসা করিতে আসিবে তাহাদের নিকট হইতে ততবার এক-দশমাংশ কর আদায় করা হইবে। অর্থাৎ বাণিজ্য উদ্দেশ্যে বৎসরে কয়েকবার আসিলে প্রত্যেকবারই উক্ত কর দিবে। কারণ তাহাদের ব্যবসায়ের মধ্যে কর ধার্য করা যাইবে না বলিয়া কোনরূপ চুক্তি তাহাদের সঙ্গে হয় নাই। আমাদের শহরবাসী (মদীনাবাসী) আলিমগণকে উক্তরূপ আমল করিতে আমি দেখিয়াছি।
রেওয়ায়ত ৪৬. সলিম ইবন আবদুল্লাহ (রহঃ) তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন-আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) নবতী অমুসলিম বাসিন্দাদের নিকট হইতে গম ও তৈলে এক-বিংশতিতমাংশ কর গ্রহণ করতেন। উদেশ্য ছিল, মদীনায় যেন এই ধরনের জিনিসের আমদানি বেশি হয়। আর ডাল জাতীয় দ্রব্যে তাহাদের নিকট হইতে এক-দশমাংশ কর গ্রহণ করিতেন।
রেওয়ায়ত ৪৮. নবতী অমুসলিম বাসিন্দাদের নিকট হইতে উমর (রাঃ) কিসের ভিত্তিতে এক-দশমাংশ কর আদায় করিতেন, এই সম্পর্কে মালিক (রহঃ) একবার ইবন শিহাব (রহঃ)-এর নিকট জানিতে চাহিলে তিনি বলিয়াছিলেনঃ জাহিলী যুগেও ইহাদের নিকট হইতে এক-দশমাংশ কর আদায় করা হইত। উমর (রাঃ) পরে তাহাই বহাল রাখেন।
২৬. সাদকাদাতা কর্তৃক সাদকা হিসাবে আদায়কৃত বস্তু ক্রয় করা বা ফিরাইয়া আনা
রেওয়ায়ত ৪৯. যায়দ ইবন আসলাম (রহঃ) তাহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন- উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ)-কে বলিতে শুনিয়াছি যে, তিনি বলেনঃ আল্লাহ্র রাস্তায় কাজে লাগাইবার জন্য আমি একবার একটা ভাল ধরনের ঘোড়া এক ব্যক্তিকে দান করিয়াছিলাম। কিন্তু সেই ব্যক্তি ঘোড়াটিকে অযত্নে একেবারে কাহিল বানাইয়া ফেলিয়াছিল। সে হয় ইহা সস্তাদরে বিক্রয় করিয়া দিবে ধারণা করিয়া আমি উহা ক্রয় করিতে মনস্থ করিলাম। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি বলিলেনঃ এক দিরহামের বিনিময়েও যদি তোমাকে দেয় তবুও ইহা ক্রয় করিও না। কারণ সাদকা করিয়া উহা ফিরাইয়া আনা বমি করিয়া পুনরায় কুকুরের মত ভক্ষণ করার মত।
রেওয়ায়ত ৫১. নাফি’ (রহঃ) বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) তাহার ওয়াদিউল-কুরা ও খায়বার নামক স্থানে অবস্থানরত দাসদেরও ফিতরা আদায় করিতেন।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ এই বিষয়ে আমি সর্বোত্তম যাহা শুনিয়াছি তাহা হইল, যাহাদের খোরপোশ প্রদান করা জরুরী তাহাদের পক্ষ হইতেও ফিতরা আদায় করিতে হইবে। মুকাতাব গোলাম, মুদাকার গোলাম এবং দাস, তাহারা উপস্থিত থাকুক বা অনুপস্থিত থাকুক, ব্যবসার উদ্দেশ্যে হউক বা না হউক, সকলের পক্ষ হইতে ফিতরা আদায় করিতে হইবে। তবে শর্ত হইল মুসলিম হইতে হইবে। আর অমুসলিম গোলামের ফিতরা আদায় করিতে হয় না।[1]
মালিক (রহঃ) বলেনঃ গোলাম পালাইয়া গেলে সে কোথায় আছে তাহা মালিকের জানা থাকিলে অথবা জানা না থাকিলে এবং গোলামের অনুপস্থিতকাল মাত্র কিছুদিনের মধ্যে সীমিত হইলে এবং তাহার বাঁচিয়া থাকা ও ফিরিয়া আসার ভরসা থাকিলে মালিককে তাহার পক্ষে সাদকা-ই-ফিতর দিতে হইবে। যদি সে পলাতক অবস্থায় দীর্ঘদিন থাকে এবং তাহাকে ফিরিয়া পাওয়া সম্পর্কে নিরাশ হয় তবে আমার মতে, তাহার জন্য মালিককে ফিতরা দিতে হইবে না। মালিক (রহঃ) বলেনঃ শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলের লোকের উপরই ফিতরা প্রদান করা ওয়াজিব। কারণ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নর-নারী, আযাদ, গোলাম প্রত্যেক মুসলিমের উপরই রমযানের কারণে সাদকা-ই-ফিতর ওয়াজিব করিয়াছেন। (গোলামের তরফ হইতে তাহার মালিক তাহা প্রদান করিবে।)
রেওয়ায়ত ৫২. আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমযানে সাদকা-ই-ফিতর হিসাবে নর-নারী, আযাদ গোলাম প্রতিটি মুসলিমের উপর এক সা’ করিয়া খেজুর কিংবা যব ধার্য করিয়াছিলেন।
রেওয়ায়ত ৫৩. ইয়ায ইবন আবদুল্লাহ ইবন সা’দ ইবন আবি সারহ আমির (রহঃ) বলেনঃ তিনি আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)-কে বলিতে শুনিয়াছেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ছা’র মাপে এক ছা’ গম বা যব বা খেজুর বা পনীর বা মুনাক্কা সাদকা-ই-ফিতর হিসাবে আদায় করিতাম ।
রেওয়ায়ত ৫৫. নাফি’ (রহঃ) বর্ণনা করেন- আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) ঈদের দুই-তিন দিন পূর্বে সাদকা-ই-ফিতর জমাকারী কর্মচারীর নিকট স্বীয় ফিতরা পাঠাইয়া দিতেন।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমি বিজ্ঞ আলিমগণকে দেখিয়াছি যে, তাহারা ঈদের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বেই ফিতরা আদায় করিয়া দেওয়া মুস্তাহাব মনে করিতেন।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ ফিতরা ঈদের নামাযে যাওয়ার পূর্বে বা পরে উভয় সময়েই আদায় করা যায়।
রেওয়ায়ত ৫৬. মালিক (রহঃ) বলেনঃ দাসের দাস, চাকর, মজুর এবং স্ত্রীর গোলামের তরফ হইতে ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব নহে। তবে যে গোলাম খেদমতে রত রহিয়াছে তাহার ফিতর দিতে হইবে।
ব্যবসার মাল হউক বা না হউক মুসলিম না হওয়া পর্যন্ত অমুসলিম গোলামদের ফিতরা আদায় করিতে হইবে না।
বর্ণনাকারী: ইবনু শিহাব আয-যুহরী (রহঃ)
রেওয়ায়ত ৭. ইবন শিহাব (রহঃ) বলেনঃ সর্বপ্রথম মুয়াবিয়া (রাঃ)-ই বেতন হইতে যাকাত আদায় করেন। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট সর্বসম্মত প্রচলিত পদ্ধতি হইল- দুই শত দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) পরিমাণ অংকে যেমন যাকাত ধার্য করা হইয়া থাকে তেমনি বিশ দীনার[1] (স্বর্ণমুদ্রা) পরিমাণ অংকেও যাকাত ফরয হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেন, দীনার ওজনে কম হইলে এবং প্রকৃত মূল্য বিশ দীনার না হইলে ইহাতে যাকাত ধার্য হইবে না। অনুরূপ বিশ দীনারের বেশি হইলে এবং প্রকৃত মূল্য বিশ দীনার পরিমাণ হইলে ইহাতে যাকাত ধার্য হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেন, বিশ দীনার হইতে কম পরিমাণ অংকে যাকাত ফরয হয় না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ দুই শত দিরহাম পরিমাণ অংক ওজনে হালকা হইলে এবং প্রকৃত মূল্য দুইশত দিরহাম না হইলে উহাতে যাকাত ধার্য হইবে না। সংখ্যায় দুই শতের বেশি হইলেও যদি প্রকৃত মূল্য দুইশত দিরহামের হয়, তবে ইহাতে যাকাত ধার্য হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ কাহারও নিকট যদি এক শত ষাট দিরহাম থাকে এবং সে যে অঞ্চলে বসবাস করে সেই শহরে এক দীনার সমান আট দিরহাম হিসেবে হইলেও (যদি সেই অনুপাতে একশত ষাট দিরহাম সমান বিশ দীনার হইয়া যায় তবুও) ইহাতে যাকাত ধার্য হইবে না। কেননা যাকাত ফরয হওয়ার জন্য কাহারও নিকট বিশ দীনার বা দুইশত দিরহাম থাকিতে হইবে।[2]
মালিক (রহঃ) বলেনঃ পাঁচ দীনার পরিমাণ অর্থ নিয়া একজন ব্যবসা শুরু করিল। বৎসর শেষ হইতে না হইতেই সে যাকাত পরিমাণ দীনারের মালিক হইয়া পড়িলে তাহাকে যাকাত আদায় করিতে হইবে। বৎসর সম্পূর্ণ হওয়ার একদিন পূর্বে বা পরে ঐ পরিমাণ দীনারের মালিক হইলেও যাকাত দিতে হইবে। পরে এই যাকাত প্রদানের দিন হইতে দ্বিতীয় এক বৎসর পূর্ণ অতিক্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত আর তাহাকে যাকাত দিতে হইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ কেহ দশ দীনার নিয়া ব্যবসা শুরু করিল, পূর্ণ বৎসর অতিক্রান্ত হইতে না হইতে সে বিশ দীনারের মালিক হইল। তাহার উপর যাকাত ধার্য করা হইবে। যেদিন হইতে বিশ দীনারের মালিক হইল সেইদিন হইতে পূর্ণ এক বৎসর অতিক্রাপ্ত হইতে হইবে, এরূপ নয়। কেননা বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার সময় সে বিশ দীনারের মালিক। পরে দ্বিতীয় এক বৎসর পূর্ণ অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত আর তাহার উপর যাকাত ধার্য হইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হইল, ক্রীতদাস কর্তৃক উপার্জিত মজুরি, ভাড়া এবং কিতাবত-চুক্তির বিনিময়ে প্রদত্ত অর্থ বা সম্পদে কম হউক বা বেশি হউক যাকাত ধার্য হইবে না, যতদিন মালিক কর্তৃক অর্থপ্রাপ্তির দিন হইতে পূর্ণ এক বৎসর অতিক্রান্ত না হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ স্বর্ণ বা রৌপ্যে যদি কয়েকজনের হিস্যা থাকে তবে যাহার হিস্যা বিশ দীনার (স্বর্ণ হইলে) বা দুইশত দিরহাম (রৌপ্য হইলে) পরিমাণ হইবে তাহার উপর যাকাত ধার্য হইবে। যাহার হিস্যা ইহার চেয়ে কম হইবে তাহার উপর যাকাত ফরয হইবে না। সকলের হিস্যাই যদি নিসাব পরিমাণ হয় কিন্তু কাহারও কম আর কাহারও বেশি হয় তবে প্রত্যেকের উপরই নিজ নিজ হিস্যানুসারে যাকাত ফরয হইবে। উহা এই জন্য যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেনঃ রৌপ্য পাঁচ উকিয়ার কম হইলে যাকাত ওয়াজিব নহে।
মালিক (রহঃ) বলেন, আমি এ বিষয়ে যাহা কিছু শুনিয়াছি উহাদের মধ্যে উল্লিখিত ফয়সালাটি আমার পছন্দনীয়।
মালিক (রহঃ) বলেন, কাহারও মালিকানাধীন স্বর্ণ ও রৌপ্য বিভিন্নজনের নিকট বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িয়া থাকিলে সাকল্য টাকা হিসাব করিয়া যাকাত দিতে হইবে।মালিক (রহঃ) বলেনঃ স্বর্ণ বা রৌপ্য যদি কেহ প্রাপ্ত হয়, তবে প্রাপ্তির দিন হইতে পূর্ণ এক বৎসর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত ইহাতে যাকাত ধার্য হইবে না।
তাহকীক ও ব্যাখ্যা দেখুন
[1] সাধারণত এক দীনার সমান দশদিরহাম হইয়া থাকে।
[2] উল্লেখ্য, যদি এই কম ওজন সমান দিরহাম বা দীনার যথার্থ ওজনের দিরহাম বা দীনারের মতই চালু থাকে তবে ইহাতেও যাকাত ধার্য হইবে।
রেওয়ায়ত ২০. যুরায়ক ইবন হাইয়ান (রহঃ) বর্ণনা করেন - যুরায়ক ছিলেন মিসরের পথে গমনকারী যাত্রীদের নিকট হইতে কর আদায়কারী কর্মচারী। উমর ইবন আবদুল আযীয (রহঃ) তাঁহাকে লিখিয়াছিলেন, তোমার এই এলাকা দিয়া কোন মুসলিম ব্যবসায়ী পথ অতিক্রম করিলে, তাহার বাণিজ্যিক সম্পদ হইতে প্রতি চল্লিশ দীনারে এক দীনার আদায় করিয়া নিও। চল্লিশ দীনার হইতে কম হইলে সেই অনুপাতে বিশ দীনার পর্যন্ত হইতে আদায় করিবে। বিশ দীনার হইতে এক-তৃতীয়াংশ দীনারও যদি কম হয় তবে তাহা ছাড়িয়া দিও। আর কোন যিম্মী বাসিন্দা ঐ পথ অতিক্রম করিলে তাহার বাণিজ্যিক সম্পদ হইতে প্রতি বিশ দীনারে এক দীনার উসুল করিবে। বিশের কম দশ দীনার পর্যন্ত হইতে সেই অনুপাতে উসুল করবে। দশ দীনার হইতে এক-তৃতীয়াংশ দীনারও কম হইলে উহা ছাড়িয়া দিবে। সম্পূর্ণ বৎসরের জন্য উসুলকৃত পরিমাণের একটা রসিদ করদাতাকে লিখিয়া দিবে যাহাতে এই কর এক বৎসরের মধ্যে তাহাকে পুনরায় দিতে না হয়।
মালিক (রহঃ) বলেন, আমাদের নিকট হুকুম হইল, কোন ব্যবসায়ী একবার যাকাত প্রদান করার পর ইহা দ্বারা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে কোন বস্তু অথবা গোলাম অথবা তদ্রুপ কিছু খরিদ করিয়া যাকাত প্রদান করার তারিখ হইতে পূর্ণ এক বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বে উহা বিক্রয় করিয়া দিলে, পূর্ণ বৎসর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত ইহাতে যাকাত ওয়াজিব হইবে না। কয়েক বৎসর পর্যন্ত যদি এই মাল বিক্রয় না করিয়া রাখিয়া দেয় তবে যখন বিক্রয় করিবে তখন শুধু ইহাতে এক বৎসরেরই যাকাত দিতে হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট মাসআলা এই- কেহ যদি ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রার বিনিময়ে গম বা খেজুর খরিদ করিয়া রাখিয়া দেয় এবং ইহাতে এক বৎসর অতিক্রান্ত হইয়া যায়, তবে যখন মাল বিক্রয় হইবে তখন নিসাব পরিমাণ হইলে ইহাতে যাকাত ওয়াজিব হইবে। ফল বা ফসলের মত ইহার হুকুম হইবে না।[1]মালিক (রহঃ) বলেনঃ কোন ব্যবসায়ীর কাছে বাণিজ্যিক মাল আছে বটে কিন্তু নগদ এত পরিমাণ টাকা তাহার হয় না যাহাতে যাকাত ধার্য হইতে পারে, বাণিজ্যিক মালের মূল্য ও নগদ অর্থ মিলাইয়া নিসাব পরিমাণ হইলে ইহাতে যাকাত ধার্য হইবে নতুবা ধার্য হইবে না। মালিক (রহঃ) বলেনঃ ব্যবসায়ে খাটান হউক বা না হউক সম্পদে বৎসরে একবারই যাকাত ধার্য হইয়া থাকে।
তাহকীক ও ব্যাখ্যা দেখুন
[1] ফসল হওয়া মাত্রই ইহার এক-দশমাংশ যাকাত হিসাবে দিতে হয়। বৎসরে যে কয়বার ফসল হইবে ততবারই তাহা আদায় করিতে হয়।
তাহকীক ও ব্যাখ্যা দেখুন
[1] ইহার উদাহরণ হইল, কাহারও নিকট চল্লিশটি ছাগী ছিল। ইহাতে একটি বকরী ধার্য হয়, কিন্তু সেই ব্যক্তি যাকাত যাহাতে ধার্য না হয় এই অভিপ্ৰায়ে এইগুলিকে দুইভাগে বিভক্ত করিয়া ফেলিল। এইরূপ করা জায়েয নহে। অথবা দুই ব্যক্তির চল্লিশটি করিয়া আশিটি বকরী ছিল। ইহাতে দুইটি বকরী ওয়াজিব হয়, কিন্তু সে এইগুলিকে একত্রিত করিয়া দেখাইল, যাহাতে একটি বকর ওয়াজিব হয়। ইহাও না-জায়েয।
রেওয়ায়ত ২৪. তাউস ইয়ামানী (রহঃ) হইতে বর্ণিত- মুয়ায ইবন জাবল (রাঃ) ত্রিশটি গাভীতে এক একটি বৎসরের বাছুর এবং চল্লিশটি গাভীতে দুই বছর বয়সের একটি গাভী গ্রহণ করিয়াছিলেন। ত্রিশের কম সংখ্যায় কিছুই তিনি নেন নাই। তখন তিনি বলিয়াছিলেন, এই বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হইতে কোন নির্দেশ আমি শুনি নাই। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে যদি পুনরায় সাক্ষাৎ ঘটে তবে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়া নিব। কিন্তু মুয়ায (রাঃ) (ইয়ামন হইতে ফিরিয়া) আসার পূর্বেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সান্নিধ্যে চলিয়া গিয়াছিলেন।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ কাহারও বকরীসমূহ দুই বা ততোধিক একত্র করার পর যে সংখ্যায় হইবে সেই অনুসারে ইহার যাকাত ধার্য হইবে। তদ্রুপ কাহারও স্বর্ণ বা রৌপ্য যদি বিভিন্ন লোকের হাতে থাকে তবে সবগুলিকে একত্র করার পর যে পরিমাণ হইবে সেই হিসাবে ইহাতে যাকাত ধার্য করা হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ কাহারও নিকট যদি ভেড়া অথবা বকরী একই পালে মিশ্রিত হইয়া থাকে তবে সবগুলি গণনা করিয়া দেখা হইবে। সবগুলি একত্রে যাকাত ধার্য হয় এমন সংখ্যায় উপনীত হইলে যাকাত ধার্য হইবে। কারণ এইগুলি ’গনম (বকরী) জাতীয় পশু। উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) তাহার পূর্বে উল্লিখিত পত্রে উল্লেখ করিয়াছেন, বকরীর সংখ্যা চল্লিশ হইলে একটি বকরী যাকাত দিবে। সংখ্যায় ভেড়া অধিক হইলে আর বকরী কম হইলে যাকাতের বেলায় ভেড়া গ্রহণ করা হইবে। আর বিপরীত হইলে বকরী লওয়া হইবে। সংখ্যায় সমান হইলে যাকাতগ্রহীতার ইখতিয়ার থাকিবে- যাহা ভাল মনে করে তাহাই গ্রহণ করিবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ তদ্রুপ আরবি বা বুখতী উট একত্রে মিলাইয়া যাকাত নেওয়া হইবে। সংখ্যায় যাহা অধিক হইবে তাহা হইতেই যাকাত গ্রহণ করা হইবে। আর সমসংখ্যক হইলে ইহা যাকাতগ্রহীতার ইখতিয়ারাধীন থাকিবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ গরু ও মহিষ একই সম্প্রদায়ভুক্ত বলিয়া গণ্য । ইহাতে উভয় জাতীয়কে একত্র করিয়া যাকাত লওয়া উচিত। যে জাতীয় পশু সংখ্যায় অধিক হইবে যাকাতে উহাই গ্রহণ করা হইলে। সমসংখ্যক হইলে যাকাত গ্রহীতার ইখতিয়ারাধীন থাকিবে। গাভী ও মহিষ উভয় দলই যদি নিসাব পরিমাণ থাকে তবে উভয় হইতে আলাদা যাকাত লওয়া হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেন, নূতনভাবে যদি কেহ পশুর মালিক হয় তবে ঐ দিন হইতে পূর্ণ এক বৎসর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত উহাতে যাকাত ধার্য হইবে না। তবে পূর্ব হইতে যদি নিসাব পরিমাণ পশু (পাঁচটি উট বা ত্রিশটি গাভী বা চল্লিশটি বকরী) তাহার নিকট থাকে আর পরে সে ক্রয় বা হেবা বা উত্তরাধিকার সূত্রে আর কিছু পশুর মালিক হয় তবে পূর্বস্থিত পশুগুলির সহিত মিশ্রণ করিয়া এইগুলিরও যাকাত আদায় করিতে হইবে যদিও এইগুলিতে পূর্ণ এক বৎসর অতিক্রান্ত হয় নাই। পূর্বস্থিত পশুগুলির যাকাত আদায় করিয়া দেওয়ার পর যদি এইগুলি তাহার মালিকানায় আসিয়া থাকে তবে পূর্বস্থিত পশুগুলির পুনরায় যখন যাকাত দিবে তখন সেই সঙ্গে এইগুলিরও যাকাত দিবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ মাস’আলাটির নজীর হইল, কেহ তাহার মালিকানাধীন রৌপ্যের যাকাত আদায় করিয়া বাকি রৌপ্য দ্বারা অন্য কোন ব্যক্তির নিকট হইতে পণ্যদ্রব্য কিনিয়া লইল। বিক্রেতার উপর উক্ত পণ্যদ্রব্যের যাকাত প্রদান করা ওয়াজিব। কাজেই এই দ্বিতীয় ব্যক্তি যাকাত দিবে। এই অবস্থায় ক্রয়কারী লোকটি যেন অদ্য তাহার যাকাত আদায় করিল আর বিক্রেতা যেন গতকাল তাহার যাকাত আদায় করিয়াছে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ নিসাব পরিমাণ হইতে কম বকরী কাহারও নিকট ছিল এবং পরে সে আরও কিছু বকরীর মালিক হইল, ইহাতে নিসাব পরিমাণের চাইতেও যদি তাহার বকরীর সংখ্যা অধিক হইয়া যায় তবুও পূর্ণ এক বৎসর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত উহাতে যাকাত ধার্য হইবে না। কারণ যাকাতের বেলায় নিসাব পরিমাণ হইতে কম দ্রব্য ধর্তব্য বলিয়া গণ্য হয় না। নিসাব পরিমাণ হইয়া যাওয়ার পর ঐ জাতীয় যত পশু তাহার মালিকানায় আসিবে, কম হউক বা বেশি হউক, সবগুলিরই যাকাত দিতে হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ নিসাব পরিমাণ পশু (উট, গরু, ছাগল) কাহারও নিকট ছিল, পরে আরও কিছু পশু যদি তাহার অধিকারে আসে তবে পূর্ণ নিসাবের সহিত এইগুলিরও যাকাত প্রদান করিতে হইবে। আর এই ব্যাপারে আমি যাহা শুনিয়াছি তন্মধ্যে এই মতটি আমার নিকট অধিক প্রিয়।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ যে ধরনের পশু যাকাতে ধার্য করা হইয়াছে সেই ধরনের পশু যদি নিসাবের অধিকারী ব্যক্তির পশুপালে না থাকে, যেমন ধার্য হইয়াছে এক বৎসর বয়সের উট আর ঐ ব্যক্তির পালে তাহা নাই, তবে দুই বৎসর বয়সের উট প্রদান করা হইবে। আর দুই, তিন বা চার বৎসর বয়সের যাকাতে ধার্যকৃত উট পশুপালে পাওয়া না গেলে, সেই ধরনের ক্রয় করিয়া তাহ আদায় করা হইবে। উহার জন্য মূল্য দ্বারা যাকাত প্রদান করা আমি পছন্দ করি না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ সেচ কার্যের বা হালের উট বা মহিষ নিসাব পরিমাণ হইলে উহাতেও যাকাত ওয়াজিব হইবে।
বর্ণনাকারী: মালিক ইবনু আনাস (রহঃ)
রেওয়ায়ত ২৫. মালিক (রহঃ) বলেনঃ দুই ব্যক্তির অংশীদারিত্বে যদি কিছু পশু থাকে এবং রাখাল, চারণক্ষেত্র, পানি পান করাইবার বালতি, নর জাতীয় পশুও যদি উভয়েরই থাকে, আর উভয়য়েই স্ব-স্ব হিস্যার পশুগুলি শনাক্ত করিতে সক্ষম থাকে, তবে এই দুই শরীককে খলীতান (خليطان) বলা হয়। আর শনাক্ত করিতে সক্ষম না থাকিলে তাহাদিগকে শরীয়তের পরিভাষায় শরীকান (شريكان) বলা হয়।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ খলীতানের প্রত্যেকেই নিসাব পরিমাণ পশুর মালিক না হইলে তাহাদের কাহারও উপর যাকাত ধার্য হইবে না। যেমন একজনের যদি চল্লিশটি বা তদূর্ধ্ব বকরী থাকে, আরেকজনের যদি কম হয়, তবে প্রথমজনের উপর যাকাত ওয়াজিব হইবে, দ্বিতীয়জনের উপর ওয়াজিব হইবে না। আর প্রত্যেক জনেরই যদি নিসাব পরিমাণ থাকে তবে উভয়ের মালিকানাধীন পশুসমূহ একত্র করিয়া যাকাত আদায় করা হইবে। সুতরাং একজনের যদি এক হাজার বা তদূর্ধ্ব বকরী হয় আর অপরজনের থাকে চল্লিশ বা তদূর্ধ্ব, তবে উভয় খলীত পরস্পরে হিসাব সম্পন্ন করিয়া স্ব-স্ব হিসানুসারে যাকাত প্রদান করিবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ উটের মধ্যে খলীত হওয়ার হুকুম বকরীর মধ্যে খলীত হওয়ার মতই। যদি উভয় খলীতের প্রত্যেকের কাছে নিসাব পরিমাণ উট থাকে তবে উভয়ের নিকট হইতে একত্রে যাকাত আদায় করা হইবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেনঃ পাঁচটির কম উটে যাকাত ওয়াজিব হয় না। উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) বলিয়াছেনঃ মাঠে বিচরণরত বকরীর সংখ্যা চল্লিশে পৌছিলে ইহাতে একটি বকরী ধার্য হয়।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ এই বক্তব্যটি আমার পছন্দনীয়। উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) বলিয়াছেনঃ যাকাত ধার্য হওয়ার ভয়ে বিভক্ত সম্পদ একত্র বা একীভূত সম্পদ বিভক্ত করা যাইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ এই বক্তব্যটির অর্থ হইল, পৃথক পৃথক দলে বিভক্ত দল একত্র করা হইবে না, যেমন তিন ব্যক্তির প্রত্যেকেরই চল্লিশটি করিয়া বকরী ছিল। উহাতে প্রত্যেকের উপরই একটি করিয়া বকরী যাকাত ধার্য হইত। কিন্তু তাহারা নিজের মালিকানাধীন বকরীসমূহ একত্র করিয়া ফেলিল। ফলে ইহাতে সকলের উপর মাত্র একটি বকরী ওয়াজিব হয়। এমনিভাবে একত্রে যে পশুর দল রক্ষিত হয় সেইগুলিকে আলাদা করা হইবে না। উহার ব্যাখ্যা নিম্নরূপ
দুই খলীতের একশত একটি করিয়া বকরী ছিল। তাহাদের উপর তিনটি বকরী যাকাত ধার্য হইবে। কিন্তু যাকাত আদায়কারী আসিলে তাহারা তাহাদের বকরীগুলি পৃথক করিয়া লইল। ইহাতে তাহাদের প্রত্যেকের একটি করিয়া বকরী যাকাত ধার্য হয়। মোদ্দা কথা, যাকাতের ভয়ে পৃথক পৃথক দলকে একত্র করা হইবে না, অথবা একীভূত দলকে পৃথক করা হইবে না। মালিক (রহঃ) বলেন, এই বিষয়ে আমি ইহাই শুনিয়াছি।
রেওয়ায়ত ২৬. সুফইয়ান ইবন আবদুল্লাহ (রাঃ) বর্ণনা করেন, উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) যাকাত উসুলকারী হিসাবে নিযুক্ত করিয়া তাহাকে এক অঞ্চলে পাঠাইয়াছিলেন। বকরী গণনা করার সময় তিনি বাচ্চাগুলিকেও গণনায় শামিল করিয়া নিতেন। ইহাতে এলাকাবাসিগণ তাহাকে বলিলেনঃ বাচ্চাগুলিকে আপনি গণনায় শামিল করেন কিন্তু যাকাতের মধ্যে ইহাকে গ্রহণ করেন না কেন? যাহা হউক, যাকাত উসুল করিয়া ফিরিয়া আসার পর উমর (রাঃ)-এর নিকট এলাকাবাসীদের প্রশ্নের কথা উল্লেখ করিলে তিনি বলিলেনঃ হ্যাঁ, বকরীর বাচ্চা এমনকি যে সমস্ত বাচ্চা রাখালগণকে কোলে তুলিয়া নিয়া যাইতে হয় সেই ধরনের বাচ্চাগুলিকে পর্যন্ত গণনায় শামিল করা হইবে। কিন্তু যাকাতের বেলায় এইগুলি আমরা গ্রহণ করি না। খাওয়ার উদ্দেশ্যে পালিত মোটাতাজা বকরী, বাচ্চারা যাহার দুধের উপর নির্ভরশীল তেমন বাচ্চাওয়ালা বকরী, ছাগ, গর্ভবতী বকরও আমরা যাকাতে গ্রহণ করি না। এক বৎসর দুই বৎসর বয়সের যাহা একেবারে বাচ্চা নহে বা একেবারে বৃদ্ধ নহে এমন ধরনের বকরীই আমরা ইহাতে গ্রহণ করিয়া থাকি।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ কাহারও নিকট যদি নিসাব পরিমাণ হইতে কম বকরী থাকে আর যাকাত উসুলকাবীর আগমনের একদিন পূর্বেও যদি এই বকরীগুলির বাচ্চা জন্মে এবং ইহাতে নিসাব পরিমাণ হইয়া যায় তবে তাহার উপর যাকাত ওয়াজিব হইবে। কারণ গণনার বেলায় বকরীর বাচ্চাও বকরীর মধ্যে শামিল হইয়া থাকে। পক্ষান্তরে কাহারও নিকট যদি নিসাব পরিমাণের কম বকরী হয়, পরে ক্রয় বা হেবা বা ওয়ারিস সূত্রে সে যদি আরও কিছু বকরীর মালিক হয় এবং ইহাতে তাহার নিকট নিসাব পরিমাণ বকরী হইয়া যায়, তবে তাহার উপর যাকাত ওয়াজিব হইবে না। প্রথমোল্লিখিত মাসআলাটির নজীর হইল- কাহারও নিকট যদি নিসাব পরিমাণ হইতে কম মূল্যের সম্পদ থাকে, আর সে যদি এমন লাভে ইহা বিক্রয় করে যাহাতে নিসাব পরিমাণ হইয়া যায়, তবে পুঁজির সহিত লাভের উপরও যাকাত ধার্য হইবে। কিন্তু ঐ লাভ যদি হেবা বা মিরাস আকারের হয় তবে হেবা বা ওয়ারিস সূত্রে প্রাপ্তির দিন হইতে পূর্ণ এক বৎসর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত ইহাতে যাকাত ওয়াজিব হইবে না। মালিক (রহঃ) বলেনঃ সুতরাং লাভ যেমন পুঁজি ও সম্পদের অন্তর্ভুক্ত হইয়া থাকে তদ্রুপ বকরীর সঙ্গে শামিল বলিয়া গণ্য হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ অন্য একটি দিক হইতে এই পূর্বোল্লিখিত বিষয় দুইটির মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতাও রহিয়াছে। তাহা হইল-কাহারও নিকট যদি এতটুকু পরিমাণ স্বর্ণ বা রৌপ্য থাকে যতটুকুর উপর যাকাত ওয়াজিব হয়, পরে যদি ঐ ব্যক্তি অন্য আরও কোন সম্পদ অর্জন করে তবে পূর্বস্থ নিসাবের সঙ্গে ইহা সম্পৃক্ত হইবে না এবং যেদিন হইতে ইহা অর্জিত হইয়াছে সেইদিন হইতে পূর্ণ এক বৎসর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত উহাতে যাকাত ধার্য হইবে না। পক্ষান্তরে কাহারও নিকট যদি উট, গাভী ও বকরী ইত্যাদি নিসাব পরিমাণ পশু থাকে এবং পরে যদি আরও কিছু পশু তাহার অধিকারে আসে তবে পূর্বস্থ নিসাবের সমজাতীয় পশুর সঙ্গে এইগুলির উপরও যাকাত আদায় করিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ এই মাসআলাটির বিষয়ে আমি যাহা শুনিয়াছি উক্ত ভাষাটিই তন্মধ্যে অধিক উত্তম।
বর্ণনাকারী: মালিক ইবনু আনাস (রহঃ)
রেওয়ায়ত ৩৫. মালিক (রহঃ) বর্ণনা করেন, যায়তুনের যাকাত সম্পর্কে ইবন শিহাব (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি বলিলেনঃ ইহাতে উশর বা উৎপন্ন শস্যের এক-দশমাংশ যাকাত ধার্য হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেন, যায়তুন দানা পিষানোর পর পাঁচ অছক পরিমাণ তৈল হইলে উহাতে উশর হইবে। পরিমাণে পাচ আছক হইতে কম হইলে উহাতে আর যাকাত ধার্য হইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেন, যায়তুনের (যাকাতের) হুকুম খেজুরে প্রযোজ্য হুকুমের মতই। বৃষ্টি, ঝর্ণা ও শিকড় দ্বারা সংগৃহীত পানি দ্বারা উৎপন্ন যায়তুন শস্যে উশর বা এক-দশমাংশ, আর সেচ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন শস্যে নিসফে উশর বা এক-বিংশতিতমাংশ যাকাত ধার্য হইবে। যায়তুনের অনুমান করিয়া বৃক্ষস্থ শস্যের পরিমাণ নির্ধারণ করিয়া যাকাত ধার্য হইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেন, যে সমস্ত শস্য মানুষ সংরক্ষণ করে এবং ভক্ষণ করে, সেই সমস্ত শস্য যদি বৃষ্টি, ঝর্ণা বা কেবল মূলের সাহায্যে সংগৃহীত পানি দ্বারা উৎপন্ন হয়, তবে পাঁচ অছক পরিমাণ হইলে উহাতে উশর বা এক-দশমাংশ, আর সেচ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হইলে এক-বিংশতিতমাংশ যাকাত ধার্য হইবে; পাঁচ অছক হইতে বেশি হইলে বর্ধিত হার অনুপাতে উহার যাকাত প্রদান করিতে হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ গম, যব, ভুট্টা, বুট, ধান, মসুর, মাষ, সিম, তিল ইত্যাদি শস্য যাহা ভোজ্যদ্রব্য হিসাবে ব্যবহৃত হয় উহার সব কিছুতেই শস্য-কর্তন ও মাড়াইয়ের পর যাকাত ধার্য হইয়া থাকে।
তিনি বলেনঃ এইসব বিষয়ে শস্য মালিকের ভাষ্য সত্য বলিয়া বিবেচ্য হইবে এবং মালিক যাহাই প্রদান করে তাহাই যাকাতে গ্রহণ করা হইবে।
ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেনঃ মালিক (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল, যায়তুন তৈলের যাকাত (উশর) পারিবারিক ব্যয় নির্বাহের পর যাহা অবশিষ্ট থাকিবে উহা হইতে আদায় করা হইবে, না ব্যয়ের পূর্বের সর্বমোট পরিমাণ হইতে আদায় করা হইবে? তিনি তখন উত্তরে বলিলেন, ব্যয়ের দিকে দৃষ্টি দেওয়া হইবে না। খাদ্য-শস্যের বেলায় যেমন মালিককে পরিমাণ জিজ্ঞাসা করা হয়, এখানেও তদ্রুপ মালিককে উৎপন্ন যায়তুনের মোট পরিমাণ জিজ্ঞাসা করিয়া নেওয়া হইবে এবং তাহাকে সত্যবাদী বলিয়া গণ্য করা হইবে। মোট কথা, পাঁচ অছক পরিমাণ যায়তুন উৎপন্ন হইলে যায়তুন দানা পিষার পর উহা হইতে উশর’ বা এক-দশমাংশ যাকাত উসুল করা হইবে, আর পাঁচ অছক পরিমাণ না হইলে উহাতে যাকাত ধার্য হইবে না।
ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেনঃ মালিক (রহঃ) বলিয়াছেনঃ শস্য পক্ক ও থোড় শুষ্ক হওয়ার পর কেহ যদি তাহা বিক্রয় করে তবে বিক্রেতার উপর উহার যাকাত ধার্য হইবে, ক্রেতার উপর ধার্য হইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ শস্য, থোড় শুষ্ক না হওয়া পর্যন্ত এবং পানির প্রয়োজন শেষ না হওয়া পর্যন্ত উহা বিক্রয় করা বৈধ নহে।
আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করিয়াছেনঃ (وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ) আর ফসল তুলিবার দিনে উহার দেয় প্রদান করবে। (সূরা আল-আন’আমঃ ১৪১) এই আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে মালিক (রহঃ) বলিয়াছেনঃ এইখানে হক অর্থ হইল উহার যাকাত প্রদান করিয়া দেওয়া। বিজ্ঞ আলিমগণকে আমি উক্ত আয়াতের অনুরূপ তফসীর করিতে শুনিয়াছি।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ বদয়িসালাহ বা পরিপক্ক হওয়ার পূর্বেই যদি কেহ স্বীয় বাগান বা শস্যক্ষেত্রের মূল বৃক্ষ বিক্রয় করিয়া দেয় তবে উহার যাকাত ক্রেতার উপর ধার্য হইবে। আর পরিপক্ক হওয়ার পর যদি বিক্রয় করে তবে ঐ শস্য বা ফলের যাকাত বিক্রেতার উপর ধার্য হইবে। তবে বিক্রয়ের সময় যদি বিক্রেতা শর্ত করে যে, যাকাত ক্রেতাকে আদায় করিতে হইবে তবে উহা ক্রেতার উপরই ধার্য হইবে।
বর্ণনাকারী: মালিক ইবনু আনাস (রহঃ)
রেওয়ায়ত ৩৬. মালিক (রহঃ) বলেনঃ কাহারও যদি চার অছক পরিমাণ খেজুর, চার অছক পরিমাণ কিসমিস, চার অছক পরিমাণ গম, চার অছক পরিমাণ কিতনিয়া বা ডাল জাতীয় শস্য উৎপন্ন হয় তবে এইগুলিকে একত্র করা হইবে না এবং একটিও নিসাব পরিমাণ (পাঁচ আছক) না হওয়ায় ঐ ব্যক্তির উপর যাকাত ধার্য হইবে না। হ্যাঁ, কোন একটি যদি নিসাব পরিমাণ অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ছা’-এর মাপে পাঁচ আছকই হইত, তবে ঐটিতে শুধু যাকাত ধার্য হইত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ পাঁচ অছকের কম পরিমাণ খেজুরের যাকাত ধার্য হইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ এক জাতীয় বস্তু হইলে নাম বা রকমের তারতম্য হইলেও উহাকে একই জিনিস বলিয়া ধরা হইবে এবং সবগুলিকে একত্র করার পর নিসাব পরিমাণ হইলে উহাতে যাকাত ধার্য হইবে, আর নিসাব পরিমাণ না হইলে উহাতে যাকাত ধার্য হইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ তেমনিভাবে গম জাতীয় সকল বস্তু, যেমন ময়দা, যব, ছাতু সবগুলিকে একই শ্রেণীভুক্ত বলিয়া গণ্য করা হইবে। শস্য কর্তনের পর সবগুলি একত্র করিয়া নিসাব পরিমাণ হইলে উহাতে যাকাত ধার্য করা হইবে, আর নিসাব পরিমাণ না হইলে যাকাত ধার্য করা হইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ তেমনিভাবে লাল বা কাল সকল কিসমিস একই জাতিভুক্ত বলিয়া গণ্য করা হইবে। কাহারও বাগানে পাঁচ অছক পরিমাণ উৎপন্ন হইলে উহাতে যাকাত ধার্য হইবে আর উক্ত পরিমাণ হইতে কম উৎপন্ন হইলে যাকাত ধার্য হইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ নাম বা রকমের তারমত্য সত্ত্বেও খেজুর, কিসমিসের মত সকল প্রকার কিতনিয়্যা বা ডাল জাতীয় শস্যকেও একই জাতিভুক্ত বলিয়া গণ্য করা হইবে। (যে সমস্ত শস্যদানা সরাসরি পাক করিয়া ভক্ষণ করা হয়, উহাদিগকে কিতন বলা হয়, যেমন চানাবুট, মাষ, সিম ইত্যাদি) ইহাদের প্রজাতিসমূহ ভিন্ন ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও একত্র করিয়া পাঁচ আছক পরিমাণ হইলে উহাতে যাকাত ধার্য হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ নবতী খৃস্টানদের কর নেওয়ার সময় উমর (রাঃ) কিতনিয়া এবং গমের মধ্যে তারতম্য করিয়াছিলেন। সকল প্রকার কিতনিয়্যাকে এক শ্রেণীভুক্ত বলিয়া তিনি গণ্য করিয়াছিলেন এবং উহাতে উশর বা এক-দশমাংশ কর ধার্য করিয়াছিলেন। অন্যপক্ষে গম ও কিসমিসের উপর এক-বিংশতিতমাংশ কর গ্রহণ করিয়াছিলেন।
মালিক (রহঃ) বলেন, কেহ যদি প্রশ্ন তোলেন কিতনিয়া বা ডাল জাতীয় সকল বস্তুকে অভিন্ন জাতি বলিয়া গণ্য করা হইয়াছে অথচ এক সের মাষকলাইয়ের সঙ্গে দুই সের মসুরির বিনিময় জায়েয আছে। একই জাতীয় যদি হইত তবে উহা জায়েয হইত না। কারণ উহা সুদের পর্যায়ে পড়িয়া যাইত। যেমন এক সের গমের বিনিময়ে দুই সের গম গ্রহণ করা যায় না। কারণ একই জাতিভুক্ত হওয়ায় উহা সুদের অন্তর্ভুক্ত হইবে।
উক্ত প্রশ্নের জবাবে বলা যাইতে পারে যে, স্বর্ণ এবং রৌপ্য যাকাতের বেলায় একত্র করিয়া ধরা যায় অথচ এক দীনার বা স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে বেশি সংখ্যক রৌপ্য মুদ্রা গ্রহণ করা জায়েয। উহা সুদ হয় না। ইহাতে বোঝা গেল, জাতি নির্ণয়ের বেলায় যাকাত ও সুদের একই হুকুম নহে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ কিছু পরিমাণ খেজুর বৃক্ষ যদি দুই ব্যক্তির শরীকানাভুক্ত থাকে আর উহাতে আট অছক পরিমাণ (অর্থাৎ প্রত্যেকের নিসাব পরিমাণ হইতে কম খেজুর) উৎপন্ন হয় তবে উহাতে যাকাত ধার্য হইবে না। একজনের হিসায় যদি পাঁচ অছক পরিমাণ (অর্থাৎ নিসাব পরিমাণ) উৎপন্ন হয় আর অন্যজনের হিসায় চার অছক পরিমাণ অর্থাৎ নিসাব পরিমাণ হইতে কম উৎপন্ন হয় তবে যাহার নিসাব পরিমাণ হইয়াছে তাহার উপরই শুধু যাকাত ধার্য হইবে।
এমনিভাবে সকল প্রকার শস্যক্ষেত্রের শরীকানার বেলায় উক্ত হুকুম প্রযোজ্য হইবে। নিসাব পরিমাণের কম হইলে যাকাত ধার্য হইবে না। আর যাহার হিস্যায় নিসাব পরিমাণ হইবে তাহার উপরই কেবল যাকাত ধার্য হইবে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট স্বীকৃত পদ্ধতি হইল, শস্যের যাকাত আদায় করার পর মালিক যদি ঐ শস্য কয়েক বৎসর গুদামজাত করিয়া রাখে এবং পরে উহা বিক্রয় করে তবে বিক্রয় করার দিন হইতে এক বৎসর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত ঐ বিক্রয়লব্ধ টাকার উপর কোন যাকাত ধার্য হইবে না। যদি ঐ শস্য হেবা, মৌরসী বা মালিকানাস্বত্বে পাইয়া থাকে তখনই কেবল উক্ত হুকুম প্রযোজ্য হইবে। কাহারও নিকট খোরাকী বাবদ কিছু শস্য বা তৈজসপত্র কয়েক বৎসর পর্যন্ত মওজুদ থাকে, পরে উহা বিক্রয় করিয়া দেয়, তবে উহাতে যেমন যাকাত ধার্য হয় না, এইখানেও তদ্রুপ যাকাত ধার্য হয় না। উক্ত শস্য যদি ব্যবসায়ের হইয়া থাকে আর উক্ত শস্যের যাকাত আদায় করার এক বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার পর উহা বিক্রয় করে, তবে বিক্রয়ের দিনই যাকাত ধার্য হইবে।
তাহকীক ও ব্যাখ্যা দেখুন
[1] অর্থের বিনিময়ে আযাদ করার চুক্তিকৃত গোলামকে মুকাতাব বলা হয়, আর আমি মরিয়া গেলে তুমি আযাদ- এই ধরনের কথা যে গোলামকে বলা হইয়াছে তাহাকে মুদাববার বলা হয়।