৭৪৭(১)। আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ আল-কাত্তান (রহঃ) ... ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সফরে ছিলাম। লোকজন সারা রাত ধরে সফর অব্যাহত রাখলো। এমনকি যখন প্রভাত ঘনিয়ে এলো তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্রাম নেয়ার জন্য যাত্রাবিরতি করলেন। লোকজনের চোখে প্রবল ঘুম চাপলো এবং তারা ঘুমিয়ে গেল, এমনকি সূর্য উপরে উঠে গেল। লোকজনের মধ্যে সর্বপ্রথম আবু বাকর (রাঃ) সজাগ হলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে সজাগ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কেউ তাকে ঘুম থেকে সজাগ করেনি। উমার (রাঃ) ঘুম থেকে সজাগ হয়ে তাঁর মাথার কাছে বসে সশব্দে তাকবীর বলতে লাগলেন। তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে সজাগ হলেন। তিনি সজাগ হয়ে দেখলেন, সূর্য উঠে গেছে। তিনি বললেনঃ তোমরা রওয়ানা হও। তিনি কিছু দূর সফর করলেন, ততক্ষণ সূর্য উজ্জ্বল হলো। তিনি জন্তযান থেকে অবতরণ করলেন এবং আমাদের নিয়ে নামায পড়লেন।
লোকজনের মধ্যে এক ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন থাকলো, আমাদের সাথে নামায পড়লো না। তিনি নামায শেষ করে বললেনঃ হে অমুক! কোন জিনিস তোমাকে আমাদের সঙ্গে নামায পড়া থেকে বিরত রেখেছে? সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি নাপাক হয়েছি। অতঃপর তিনি তাকে পাক মাটি দিয়ে তাইয়াম্মুম করে নামায পড়ার নির্দেশ দিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দ্রুত সামনের একটি কাফেলায় গিয়ে পানি তালাশ করতে বললেন। তখন আমরা প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত ছিলাম। তথাপি আমরা সফর অব্যাহত রাখলাম। আমরা সামনে এক মহিলাকে দেখতে পেলাম। সে তার পদদ্বয় পানির মশকের সাথে ঝুলিয়ে রেখেছিল। আমরা তাকে বললাম, পানি কোথায়? সে বলল, এখানে পানি নেই। আমরা তাকে বললাম, তোমার পরিবার থেকে পানি কতটুকু দূরে? সে বলল, এক দিন এক রাতের পথ (দূরে)।
আমরা তাকে বললাম, তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট চলো। সে বলল, রাসূলুল্লাহ কি? তার আমাদের সাথে না গিয়ে কোন উপায়ান্তর ছিলো না। অতএব আমরা তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এলাম এবং সে যা বলেছে তাও তাঁর নিকট বর্ণনা করলাম। তবে সে বলল, সে ইয়াতীম শিশুর জননী। তিনি বলেন, তিনি তার মশক দু’টি নামানোর নির্দেশ দিলেন। আমরা চল্লিশজন পিপাসিত ব্যক্তি তৃপ্তি মিটিয়ে পানি পান করলাম এবং আমাদের সমস্ত মশক ও পাত্র ভরে (পানি) নিলাম। আমাদের ঐ সঙ্গী গোসল করলো। তবে আমরা উট হাঁকাইনি (পানি পান করাইনি)। তার মশক পানির প্রাচুর্যে ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
তিনি আমাদের বললেনঃ তোমাদের কাছে যা আছে নিয়ে এসো। অতএব সেই মহিলার জন্য মাংস ও খেজুর একত্র করা হলো। এমনকি তার জন্য একটি থলিতে তা ভর্তি করা হলো। এরপর তিনি বললেনঃ তুমি যাও এবং এ থেকে তোমার পরিবারের লোকদের খেতে দাও। আর তুমি জেনে রাখো! আমরা তোমার পানি মোটেও খরচ করিনি। সে তার পরিবারের লোকজনের নিকট এসে বলল, আমি অবশ্যই একজন বড় যাদুকরের সাথে সাক্ষাৎ করেছি, তবে কি তিনি নবী? যেমন তারা ধারণা করেন। আল্লাহ সেই মহিলার কারণে ঐ সম্প্রদায়কে হেদায়াত দান করেন। ফলে সেই মহিলা ইসলাম গ্রহণ করলো এবং তারাও ইসলাম গ্রহণ করলো (বুখারী, তায়াম্মুম, বাব ৬, নং ৩৪৪; মুসলিম)।
৭৪৮(২). আল-হুসাইন ইবনে ইসমাঈল (রহঃ) ... ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক রাতে আমাদের নিয়ে সফর করলেন। অতঃপর আমরা (রাতের শেষভাগে) ঘুমিয়ে গেলাম এবং (সকালবেলা) আমরা কেবল সূর্যের তাপেই সজাগ হলাম। আমাদের মধ্যে ছয় ব্যক্তি (প্রথমে) সজাগ হলো যাদের নাম আমি ভুলে গেছি। তারপর আবু বাকর (রাঃ) সজাগ হলেন এবং তিনি তাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জাগাতে নিষেধ করলেন। তিনি বললেন, হতে পারে আল্লাহ তাকে কোন প্রয়োজনে (ঘুমে) আটক করে রেখেছেন। আবু বাকর (রাঃ) অধিক তাকবীর ধ্বনি দিতে থাকলেন। ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সজাগ হলেন। তারা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের নামাযের ওয়াক্ত চলে গেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমাদের নামাযের ওয়াক্ত চলে যায়নি। তোমরা এই স্থান থেকে প্রস্থান করো।
এরপর তিনি রওয়ানা হয়ে কিছু দুর গেলেন, তারপর বাহন থেকে অবতরণ করে নামায পড়লেন। তিনি বললেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। তারা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে নামায পড়েনি। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ কোন্ জিনিস তোমাকে নামায পড়তে বাধা দিয়েছে? সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি নাপাক হয়েছি। তিনি বললেনঃ তুমি পাক মাটি দিয়ে তাইয়াম্মুম করে নামায পড়ো। আর যখন তুমি পানি ব্যবহার করার সুযোগ পাবে, তখন গোসল করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী (রাঃ)-কে পানির খোঁজে পাঠালেন। আমাদের প্রত্যেকের কাঁধে খরগোশের দুই কান সুদৃশ পাত্র ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিপাসার্ত হলে আমরা দ্রুত তাঁর নিকট পানি নিয়ে যেতাম। আলী (রাঃ) পানির খোঁজে চলে গেলেন। কিন্তু অনেক বেলা হয়ে গেল তখনও তিনি পানি পেলেন না। উৎকণ্ঠিত হয়ে আলী (রাঃ) বললেন, তোমরা এখানে অপেক্ষা করো, আমি দেখে আসি ওটা কি?
রাবী বলেন, দেখা গেল, দুইটি পানির মশকের মাঝখানে এক মহিলা। তাকে বলা হলো, হে আল্লাহর দাসী! কোথায় পানি পাওয়া যায়? সে বলল, পানি নেই। তোমাদের আল্লাহর শপথ করে বলছি। আমি গতকাল পানি পান করেছি। এরপর আমি পূর্ণ এক রাত-দিন সফর করেছি। এই মুহুর্তে আমি এখানে। তারা তাকে বললেন, তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট চলো। সে বলল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে? তারা বললেন, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। সে বলল, কুরাইশ গোত্রের পাগল! তারা বললেন, নিশ্চয়ই তিনি পাগল নন, বরং আল্লাহর রাসূল। সে বলল, হে লোকসকল! তোমরা আমার রাস্তা ছেড়ে দাও। আল্লাহর শপথ! আমি আমার বাচ্চা মেয়েকে ছাগলের পালে রেখে এসেছি। অবশ্যই আমি ভয় পাচ্ছি যে, আমি তথায় পৌছে তাদেরকে পাবো না, এমনকি তাদের কতক তৃষ্ণায় মারা যেতে পারে। তারা তার কথায় কর্ণপাত না করে তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট নিয়ে এলেন।
তিনি তার উট সম্পর্কে নির্দেশ দিলে তা বসানো হলো, এরপর তিনি মশকের উপরিভাগের মুখ খোললেন, তারপর একটি বৃহদাকার পাত্র নিয়ে ডাকলেন। তিনি পানি দিয়ে সেই পাত্র ভরে পাশের ব্যক্তিকে দিলেন এবং বললেন, যাও, (এই পানি দিয়ে) গোসল করো। রাবী বলেন, আল্লাহর শপথ! আমরা সমস্ত পাত্র ও মশক পানি দিয়ে ভরলাম, আর সেই (মহিলা) তা দেখছিল। তারপর তিনি মশকের উপরিভাগের মুখ বাঁধলেন এবং তাকে উটসহ পাঠিয়ে দিলেন। তিনি বললেনঃ হে মহিলা! তোমার পানি ফেরত লও। আল্লাহর শপথ! যদি আল্লাহ পানি বাড়িয়ে না দিতেন (তাহলে কতইনা অসুবিধা হতো)। তোমার পানি এক ফোটাও কমেনি, তিনি তার জন্য একটি চাদর নিয়ে ডাকলেন এবং তা বিছিয়ে দিলেন, তারপর আমাদের বললেনঃ যার কাছে যা কিছু আছে সে যেন তা নিয়ে আসে। অতএব কেউ পুরাতন জুতা, কেউ পুরাতন কাপড়, কেউ এক মুষ্টি বার্লি, কেউ এক মুষ্টি খেজুর এবং কেউ রুটির টুকরা আনলো। তিনি তার জন্য এগুলো জমা করলেন, তারপর এগুলো তার জন্য বাঁধলেন, অতঃপর তার নিকট তার গোত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে তাকে অবহিত করলো।
রাবী বলেন, সে তার গোত্রে ফিরে এলো। তারা বলল, কোন জিনিস তোমাকে আটকিয়ে রেখেছিল? সে বলল, আমাকে কুরাইশ গোত্রের এক পাগলে ধরেছিল। আলাহর শপথ! নিশ্চয়ই সে দুইজনের একজন। হয় সে আসমান ও জমিনের মাঝে সর্বাধিক অভিজ্ঞ জাদুকর অথবা নিশ্চয়ই সে আল্লাহর সত্য রাসূল। রাবী বলেন, তাদের নিকটবর্তী যারা ছিল, তাদের উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অশ্বারোহী বাহিনী আক্রমণ করলো, কিন্তু তারা (ঐ নারীর গোত্র) নিরাপদ থাকলো। রাবী বলেন, (সেই) মহিলা তার গোত্রকে বলল, হে (আমার) গোত্র! আল্লাহর শপথ! আমি এই ব্যক্তিকে তোমাদের পানি নেয়ার পর তার জন্য তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেই দেখেছি। তোমরা কি দেখো না, তিনি তোমাদের পার্শ্ববর্তী। লোকদের আক্রমণ করেছেন, কিন্তু তোমরা তার থেকে নিরাপদ রয়েছ, তিনি তোমাদের আক্রমণ করছেন না? তোমাদের কি কল্যাণ লাভের প্রয়োজন আছে? তারা বলল, তা (কল্যাণ) কি? মহিলা বলল, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করবো। রাবী বলেন, অতএব সেই মহিলা তার পরিবারের তিরিশজনকে নিয়ে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বাইআত হলো এবং ইসলাম গ্রহণ করলো।